গবেষণার জন্য সারাবিশ্বের বিজ্ঞানীদের নিয়োগ দিচ্ছে ইউনিভার্সিটি হেলথ নেটওয়ার্ক

জুমু চৌধুরী

বিশ্বজুড়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণার মানচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে কানাডা।

বিশ্বজুড়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণার মানচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে কানাডা। এমন এক সময়ে যখন যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন গবেষণা কর্মসূচির জন্য সরকারি তহবিল সংকুচিত হচ্ছে এবং অনেক গবেষক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছেন, তখন কানাডা নিজেদের গবেষণা অবকাঠামোকে আরও শক্তিশালী করতে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের আকৃষ্ট করার উদ্যোগ জোরদার করেছে।

কানাডার বৃহত্তম স্বাস্থ্য ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম ইউনিভার্সিটি হেলথ নেটওয়ার্ক (ইউএইচএন) বিদেশি বিজ্ঞানীদের জন্য একটি উচ্চাভিলাষী কর্মসূচি চালু করেছে। ‘কানাডা লিডস’ নামে পরিচিত এই উদ্যোগের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতিভাবান গবেষকদের কানাডায় এনে গবেষণা কার্যক্রমে যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য হলো ক্যারিয়ারের শুরুতে কিংবা মধ্যপর্যায়ে থাকা অন্তত ১০০ জন শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানীকে কানাডায় নিয়ে আসা। শুধু নতুন গবেষক তৈরি করাই নয়, বরং বৈশ্বিক লাইফ সায়েন্স ও চিকিৎসাবিজ্ঞান গবেষণায় কানাডাকে একটি নেতৃত্বস্থানীয় অবস্থানে নিয়ে যাওয়াই এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলো বর্তমানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে দক্ষ মানবসম্পদ আকৃষ্ট করার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যে দেশ গবেষণা ও উদ্ভাবনে এগিয়ে থাকবে, ভবিষ্যতের অর্থনীতি ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় তারাই নেতৃত্ব দেবে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে কানাডা এমন গবেষণা ক্ষেত্রগুলোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে, যেগুলো একদিকে জনস্বাস্থ্যের উন্নতিতে অবদান রাখবে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন সম্ভাবনাও সৃষ্টি করবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োমেডিক্যাল গবেষণা, জিনতত্ত্ব, ক্যানসার চিকিৎসা এবং উন্নত স্বাস্থ্য প্রযুক্তি এসব অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ক্ষেত্রের মধ্যে রয়েছে।

ইউএইচএনের বিজ্ঞান ও গবেষণা বিভাগের নির্বাহী ভাইস-প্রেসিডেন্ট ব্র্যাড উটারস বলেছেন, কর্মসূচিটি শুধুমাত্র সংখ্যার ওপর নির্ভর করে নয়; বরং সর্বোচ্চ মানসম্পন্ন গবেষক নির্বাচনের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। তার ভাষায়, “আমরা এই উদ্যোগের জন্য অত্যন্ত উচ্চ মানদণ্ড নির্ধারণ করেছি। যারা নির্বাচিত হচ্ছেন, তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে অসাধারণ সম্ভাবনাময় গবেষক।”

কর্মসূচি চালুর এক বছরের মধ্যেই উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে ইউএইচএন। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৮০ জন বিজ্ঞানীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যদিও এই সংখ্যা ১০০-র লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কিছুটা কম, তবুও আগ্রহের মাত্রা প্রত্যাশার চেয়েও বেশি। ইউএইচএনের হিসাব বলছে, এ পর্যন্ত ৮০০-এর বেশি গবেষক কর্মসূচিটির প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। বিভিন্ন দেশ থেকে আসা এসব আবেদন প্রমাণ করছে যে আন্তর্জাতিক গবেষকদের কাছে কানাডা ক্রমেই একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠছে। ব্র্যাড উটারস জানান, প্রাথমিক অভিজ্ঞতা অত্যন্ত ইতিবাচক। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মেধাবী গবেষকরা কানাডার গবেষণা পরিবেশ, অর্থায়নের সুযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার সম্ভাবনার কারণে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।

‘কানাডা লিডস’ কর্মসূচিটি মূলত তরুণ ও মধ্যপর্যায়ের গবেষকদের জন্য পরিকল্পিত হলেও বাস্তবে এর প্রভাব আরও বিস্তৃত হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে গবেষণা তহবিল নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার পর অনেক অভিজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ গবেষকও কানাডায় কাজের সুযোগ খুঁজছেন। উটারসের মতে, কানাডা সরকারের আর্থিক সহায়তা এই আগ্রহকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে শুধু উদীয়মান গবেষক নয়, প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানীরাও কানাডার গবেষণা প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করছেন।

আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিভা আকৃষ্ট করার জন্য কানাডা সরকারও বড় ধরনের আর্থিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সর্বশেষ ফেডারেল বাজেটে বিদেশি গবেষকদের সহায়তা ও কানাডায় নিয়ে আসার লক্ষ্যে আগামী ১২ বছরের জন্য ১৭০ কোটি ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই অর্থ ব্যয় করা হবে ‘কানাডা গ্লোবাল ইম্প্যাক্ট প্লাস রিসার্চ ট্যালেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ কর্মসূচির মাধ্যমে। সরকারের আশা, এই বিনিয়োগ শুধু গবেষণার মান উন্নত করবে না, বরং নতুন উদ্ভাবন, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মসংস্থান তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

আন্তর্জাতিক গবেষণা জগতে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ছিল সবচেয়ে আকর্ষণীয় গন্তব্য। উন্নত গবেষণা অবকাঠামো, বিপুল তহবিল এবং বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষকদের সেখানে কাজ করতে উৎসাহিত করত। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তহবিল সংকোচন, অভিবাসন নীতির পরিবর্তন এবং গবেষণা প্রকল্পে অনিশ্চয়তা অনেক বিজ্ঞানীকে বিকল্প গন্তব্যের কথা ভাবতে বাধ্য করছে। এই পরিস্থিতিতে কানাডা নিজেকে একটি স্থিতিশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং গবেষণাবান্ধব দেশ হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। যদি বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তাহলে আগামী দশকে কানাডা বৈশ্বিক গবেষণা ও উদ্ভাবনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। আর ‘কানাডা লিডস’-এর মতো উদ্যোগ সেই দীর্ঘমেয়াদি কৌশলেরই গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিজ্ঞান ও গবেষণার বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতায় কানাডার এই পদক্ষেপ শুধু প্রতিভা আকর্ষণের প্রচেষ্টা নয়; বরং ভবিষ্যতের জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গঠনের জন্য একটি সুপরিকল্পিত বিনিয়োগ বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

Related Articles

Back to top button