
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বজুড়ে ডেটা সেন্টারের সংখ্যা বাড়ছে। তবে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির এই যাত্রাপথে পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে উদ্বেগও সমানতালে বাড়ছে। সেই উদ্বেগ থেকেই এ বছর ভ্যানকুভারে নির্মাণের পরিকল্পনা থাকা দুটি এআই ডেটা সেন্টারের বিরুদ্ধে শনিবার রাস্তায় নামলেন কয়েকশ মানুষ।
শহরের ওয়াটারফ্রন্ট স্টেশনে সকাল থেকেই জড়ো হতে শুরু করেন পরিবেশবাদী, স্থানীয় বাসিন্দা এবং বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনের সদস্যরা। পরে তারা মিছিল করে গ্র্যানভিল স্ট্রিট হয়ে ডাউনটাউন পেনিনসুলার দিকে অগ্রসর হন। বিক্ষোভকারীদের মূল অভিযোগ ছিল, বৃহৎ এআই ডেটা সেন্টারগুলো বিপুল পরিমাণ পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহার করে, যা দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
প্রতিবাদকারীদের হাতে থাকা ব্যানার ও প্ল্যাকার্ডে ডেটা সেন্টারের অতিরিক্ত পানি ব্যবহারের সমালোচনা উঠে আসে। অনেকেই দাবি করেন, এআই প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে যে অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে, তার পরিবেশগত মূল্য সম্পর্কে যথেষ্ট আলোচনা হচ্ছে না।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ন্যাটালি নামের এক প্রতিবাদকারী বলেন, “যা ঘটছে তা সত্যিই ভয়ঙ্কর। এই ধরনের প্রকল্প ধীরে ধীরে প্রাকৃতিক সম্পদ নিঃশেষ করে দিচ্ছে এবং যেসব মানুষের জীবন-জীবিকা মাটি ও স্থানীয় পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলছে।” তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি অঞ্চলের উদাহরণ টেনে বলেন, সেখানে বৃহৎ ডেটা সেন্টার স্থাপনের ফলে স্থানীয় পানি সম্পদের ওপর চাপ বেড়েছে এবং কিছু এলাকায় কৃষি ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব পড়েছে।
ডেটা সেন্টারের হাজার হাজার সার্ভার সবসময় সক্রিয় থাকে এবং এগুলো প্রচুর তাপ উৎপন্ন করে। সেই তাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রয়োজন হয় উন্নত কুলিং সিস্টেমের। অনেক ক্ষেত্রেই এই শীতলীকরণ ব্যবস্থার জন্য বিপুল পরিমাণ পানি ব্যবহার করা হয়। ফলে খরা বা পানির সীমিত প্রাপ্যতা থাকা অঞ্চলে ডেটা সেন্টার নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ ও পানি চাহিদাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পরিবেশবাদীদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে এই প্রবণতা আরও তীব্র হতে পারে।
তবে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কানাডিয়ান টেলিকম প্রতিষ্ঠান টেলাস দাবি করেছে, ভ্যানকুভারের পরিকল্পিত ডেটা সেন্টারগুলো প্রচলিত মডেলের তুলনায় অনেক বেশি পরিবেশবান্ধব হবে। সরকারি অংশীদারিত্বে নির্মিতব্য এই অবকাঠামোকে তারা “টেকসই এআই অবকাঠামোর বৈশ্বিক মানদণ্ড” হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। কোম্পানির দাবি, ডেটা সেন্টারে অত্যাধুনিক ‘ক্লোজড-লুপ কুলিং সিস্টেম’ ব্যবহার করা হবে, যা পানির ব্যবহার প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনতে সক্ষম। এছাড়া কেন্দ্রগুলো পরিচালনার জন্য প্রায় ৯৮ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
টেলাস আরও জানিয়েছে, তাদের ডেটা সেন্টার ভ্যানকুভারের মাউন্ট প্লেজ্যান্ট এলাকার নেবারহুড এনার্জি ইউটিলিটি এবং ডাউনটাউন ডিস্ট্রিক্টের ক্রিয়েটিভ এনার্জি নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। এর ফলে ডেটা সেন্টার থেকে উৎপন্ন অতিরিক্ত তাপ পুনর্ব্যবহার করে স্থানীয় ভবন ও অন্যান্য স্থাপনায় ব্যবহার করা সম্ভব হবে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, এটি শুধু শক্তির অপচয় কমাবে না, বরং সামগ্রিক কার্বন নিঃসরণও হ্রাস করবে।
ভ্যানকুভারের এই বিক্ষোভ আসলে একটি বৃহত্তর বৈশ্বিক বিতর্কের প্রতিফলন। একদিকে এআই প্রযুক্তি অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও গবেষণায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলছে; অন্যদিকে এই প্রযুক্তিকে সচল রাখতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে প্রশ্নও ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। ভ্যানকুভারের ঘটনাটি দেখিয়ে দিল, ভবিষ্যতের প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক লাভ বা প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পানি, বিদ্যুৎ, পরিবেশ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থও। ফলে নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও পরিবেশগত দায়বদ্ধতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
মাসুদ করিম : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার



