তৃতীয় উষ্ণতম বছর ২০২৫

জামির হোসেন

মানব আচরণের কারণে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন বৈশ্বিক পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।

মানব আচরণের কারণে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন বৈশ্বিক পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সাল বিশ্বে তৃতীয় উষ্ণতম বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন জলবায়ু বিজ্ঞানীরা। গবেষকদের মতে, এটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয় বরং ভবিষ্যতের জন্য এক গভীর সতর্কসংকেত।

বিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে নির্ধারিত বৈশ্বিক উষ্ণতার সীমা প্রথমবারের মতো ভেঙে গেছে তিন বছরের গড় তাপমাত্রায়। ওই চুক্তিতে শিল্পপূর্ব সময়ের তুলনায় বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি সর্বোচ্চ ১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, বাস্তবে সেই সীমা আর ধরে রাখা যাচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, যদি বিশ্ব তাপমাত্রা এই সীমার নিচে রাখা যেত, তাহলে লাখো মানুষের জীবন রক্ষা সম্ভব হতো এবং বহু পরিবেশগত বিপর্যয় এড়ানো যেত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংখ্যা ও তীব্রতা দুটোই বাড়ছে।

ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন (ডব্লিউডব্লিউএ)–এর গবেষকদের সর্বশেষ বিশ্লেষণ মঙ্গলবার ইউরোপে প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, লা নিনা আবহাওয়া পরিস্থিতি বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও বৈশ্বিক তাপমাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে উঁচু অবস্থানে রয়েছে। সাধারণত লা নিনা বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা কিছুটা কমাতে সহায়তা করে, কিন্তু এবার তার বিপরীত চিত্র দেখা গেছে।

গবেষকরা জানিয়েছেন, জীবাশ্ম জ্বালানির অব্যাহত দহনই উষ্ণতা বৃদ্ধির মূল কারণ। কয়লা, তেল ও গ্যাস পোড়ানোর ফলে বিপুল পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস বায়ুমণ্ডলে জমা হচ্ছে, যা পৃথিবীর তাপ ধরে রেখে বৈশ্বিক উষ্ণতাকে আরও ত্বরান্বিত করছে।

ডব্লিউডব্লিউএর সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের জলবায়ু বিজ্ঞানী ফ্রেডেরিক ওটো বলেন, “আমরা যদি খুব দ্রুত এবং কার্যকরভাবে জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো বন্ধ করতে না পারি, তাহলে উষ্ণতা বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরে রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে যাবে। বিজ্ঞান এখন বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করছে।”

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, চরম আবহাওয়া এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং এটি প্রতি বছর নিয়মিতভাবেই মানুষের জীবন ও অর্থনীতিতে বিপুল ক্ষতি ডেকে আনছে। শুধু ২০২৫ সালেই চরম আবহাওয়া সংক্রান্ত ১৫৭টি ঘটনা শনাক্ত করেছেন ডব্লিউডব্লিউএর বিজ্ঞানীরা। এসব ঘটনায় একশর বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মধ্যে ২২টি ঘটনাকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যেখানে তাপপ্রবাহ, বন্যা, খরা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগ অন্তর্ভুক্ত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য অবিলম্বে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকতে হবে, কার্বন নিঃসরণ কমাতে হবে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও শক্তিশালী ও বাস্তবভিত্তিক জলবায়ু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। নচেৎ ভবিষ্যতে বিশ্বকে আরও ভয়াবহ জলবায়ু সংকটের মুখোমুখি হতে হবে যার প্রভাব থেকে কোনো দেশই রেহাই পাবে না।

Related Articles

Back to top button