দুই শিশুর নিখোঁজের বিষয়ে জবাব চেয়ে নোভা স্কশিয়ায় বিক্ষোভ

জামির হোসেন

কানাডার নোভা স্কশিয়া প্রদেশের কেন্দ্রাঞ্চলে শনিবার বিকেলে এক আবেগঘন ও প্রতিবাদমুখর সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

কানাডার নোভা স্কশিয়া প্রদেশের কেন্দ্রাঞ্চলে শনিবার বিকেলে এক আবেগঘন ও প্রতিবাদমুখর সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। পরিষ্কার আকাশের নিচে প্রায় পঞ্চাশজন মানুষ স্থানীয় আরসিএমপি ডিটাচমেন্টের সামনে জড়ো হয়ে ঠিক এক বছর আগে নিখোঁজ হওয়া দুই শিশুর ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা ও তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

সমাবেশে অংশ নেওয়া মানুষজনের হাতে ছিল পোস্টার, ব্যানার এবং দুই শিশুর ছবি। তারা বারবার দাবি জানান এক বছর পেরিয়ে গেলেও কেন তদন্তে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই, কেন পরিবার এখনো নিশ্চিত কোনো উত্তর পাচ্ছে না এবং কেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আরও স্বচ্ছভাবে জনগণের সামনে তথ্য তুলে ধরছে না।

২০২৫ সালের ২ মে সকালে রয়্যাল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশ বা আরসিএমপি জানতে পারে যে ছয় বছর বয়সী লিলি সুলিভান এবং তার চার বছরের ভাই জ্যাক নিখোঁজ হয়েছে। দুই শিশুকে শেষবার দেখা গিয়েছিল হ্যালিফ্যাক্স থেকে প্রায় ১৪০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত গ্রামীণ ল্যান্সডাউন স্টেশন এলাকার তাদের বাড়ির আশপাশে।

প্রথমদিকে ধারণা করা হয়েছিল, শিশুরা হয়তো বাড়ির কাছাকাছি কোথাও ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। ব্যাপক অনুসন্ধান অভিযান চালানো হলেও তাদের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। ড্রোন, কুকুর, হেলিকপ্টার এবং শত শত স্বেচ্ছাসেবক নিয়ে অনুসন্ধান পরিচালিত হলেও তদন্তকারীরা খুব কম সূত্রই পেয়েছেন।

এ সপ্তাহে তদন্তসংশ্লিষ্ট এক জ্যেষ্ঠ আরসিএমপি কর্মকর্তা স্টাফ সার্জেন্ট রব ম্যাকক্যামন সাংবাদিকদের বলেন, শিশু দুটির জীবিত থাকার সম্ভাবনা এখন অত্যন্ত কম। তার এই মন্তব্য পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন করে হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। তিনি জানান, তদন্তে এখন পর্যন্ত অপহরণের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একইভাবে কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট ইঙ্গিতও মেলেনি। ম্যাকক্যামনের ভাষায়, “আমরা সম্ভাব্য সব ধরনের দিক খতিয়ে দেখেছি। এখন পর্যন্ত এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি যা অপহরণ বা পরিকল্পিত অপরাধের দিকে সরাসরি ইঙ্গিত করে।” তবে পুলিশের এই বক্তব্য অনেকের মন থেকে সন্দেহ দূর করতে পারেনি। সমাবেশে উপস্থিত কয়েকজনের অভিযোগ, তদন্তের শুরুতেই গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় যথাযথভাবে গুরুত্ব পায়নি।

নোভা স্কশিয়ার স্টেলারটনে আয়োজিত “র‌্যালি ফর জাস্টিস” সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে জ্যাক ও লিলির দাদী আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, এক বছর পেরিয়ে গেলেও পরিবার এখনো অন্ধকারে রয়েছে। সমাবেশের আগে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “এক বছর হয়ে গেছে, কিন্তু এখনো অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। আমরা শুধু সত্য জানতে চাই। মানুষ যেন আরও জোরালোভাবে উত্তর দাবি করে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে আরও উন্মুক্ততা চায়।” তিনি আরও বলেন, “আমরা তদন্তে বাধা সৃষ্টি করতে চাই না। কিন্তু পরিবার হিসেবে অন্তত জানতে চাই কী ঘটেছিল, কোথায় তদন্ত দাঁড়িয়ে আছে এবং কেন এত কম তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে।”

সমাবেশে অংশ নেওয়া স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে মনে করেন, তদন্ত নিয়ে আরসিএমপি শুরু থেকেই খুব সীমিত তথ্য দিয়েছে। এতে গুজব ও বিভ্রান্তি বেড়েছে। একজন অংশগ্রহণকারী বলেন, “যদি অপরাধের প্রমাণ না-ও থাকে, তবুও শিশু দুটির কী হয়েছিল, সেটি তো জানা জরুরি। আমরা চাই পুলিশ জনগণের সঙ্গে আরও খোলামেলা আচরণ করুক।” আরেকজন বলেন, “এই ঘটনাটি শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়, পুরো কমিউনিটির জন্য এক গভীর ক্ষত।”

আরসিএমপি জানিয়েছে, মামলাটি এখনো সক্রিয় তদন্তের আওতায় রয়েছে। তদন্তকারীরা নতুন তথ্য বা সাক্ষ্যপ্রমাণের অপেক্ষায় আছেন। যদিও দীর্ঘ সময় ধরে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সূত্র না পাওয়ায় তদন্তের গতি অনেকটাই মন্থর হয়ে পড়েছে। তবুও পরিবার আশা ছাড়তে নারাজ। তাদের বিশ্বাস, একদিন না একদিন সত্য সামনে আসবেই। আর সেই আশাতেই তারা মানুষের সমর্থন ও গণমাধ্যমের মনোযোগ ধরে রাখতে চাইছেন।

এক বছর পরও লিলি ও জ্যাকের রহস্যজনক অন্তর্ধান নোভা স্কশিয়ার মানুষের মনে গভীর বেদনা ও অস্বস্তির জন্ম দিচ্ছে। উত্তরহীন এই প্রশ্ন এখন শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের বিবেককে নাড়া দিচ্ছে।

Related Articles

Back to top button