
কানাডার অর্থনীতি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর কথা বলা হলেও বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। দেশটির সরকারি পরিসংখ্যান সংস্থা স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার সর্বশেষ সমীক্ষা বলছে, ২০২৪ সালে দেশটিতে দারিদ্র্যের হার কার্যত অপরিবর্তিত রয়েছে এবং তা এখনো মহামারিকালীন ২০২০ সালের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
নতুন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৪ সালে কানাডার মোট জনসংখ্যার প্রায় ১১ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছে। সংখ্যার হিসেবে যা প্রায় ৪৫ লাখ মানুষ। যদিও ২০২৩ সালে এই হার ছিল ১১ দশমিক ১ শতাংশ, তবে ২০২০ সালে এটি ছিল মাত্র ৭ শতাংশ। অর্থাৎ চার বছরের ব্যবধানে দারিদ্র্যের বোঝা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং সেই অবস্থার খুব বেশি উন্নতি হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার হলেও জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন সংকট এবং খাদ্যমূল্যের লাগামহীন বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনকে ক্রমেই কঠিন করে তুলেছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে রয়েছে।
দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক অবস্থা দেখা গেছে নুনাভাট অঞ্চলে। সেখানে দারিদ্র্যের হার পৌঁছেছে ৩১ দশমিক ৭ শতাংশে। অর্থাৎ প্রতি তিনজনের একজন কার্যত দারিদ্র্যের মধ্যে জীবনযাপন করছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উত্তরাঞ্চলীয় এই এলাকায় পরিবহন ব্যয়, খাদ্যের উচ্চ মূল্য, জ্বালানির অতিরিক্ত খরচ এবং সীমিত কর্মসংস্থানের কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে আয় বাড়লেও বাস্তব ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে।
এরপর সবচেয়ে বেশি দারিদ্র্যের হার দেখা গেছে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায়, যেখানে হার ১৩ শতাংশ। আর অন্টারিওতে এই হার ১২ দশমিক ৫ শতাংশ। বিশেষ করে বড় শহরগুলোতে বাড়িভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম দ্রুত বাড়ায় মানুষ চাপে পড়েছে। অন্যদিকে, কুইবেক দীর্ঘদিন ধরেই তুলনামূলক কম দারিদ্র্যের অঞ্চলের তালিকায় রয়েছে। আগের বছরগুলোতে সেখানে দারিদ্র্যের হার ছিল প্রায় ৭ শতাংশ, যা দেশের মধ্যে সর্বনিম্নগুলোর একটি।
টরন্টো মেট্রোপলিটান ইউনিভার্সিটির টেড রজার্স স্কুল অব ম্যানেজমেন্টের সহযোগী অধ্যাপক অ্যালিসন কেম্পার মনে করেন, দারিদ্র্যের হার স্থিতিশীল থাকলেও সেটিকে ইতিবাচক উন্নতি বলা যাবে না। কারণ বাস্তবে সাধারণ মানুষের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছেই। তার ভাষায়, কানাডার বহু মানুষ এখন খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা, আবাসন সংকট এবং জ্বালানির উচ্চমূল্যের সঙ্গে লড়াই করছে। অনেক পরিবার মাসের শেষে নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতেই হিমশিম খাচ্ছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে ভাড়া বাড়ার কারণে নিম্ন আয়ের মানুষের বড় অংশকে আয়ের অধিকাংশই বাসস্থানের পেছনে ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা কিংবা পুষ্টির মতো মৌলিক ক্ষেত্রগুলোতে ব্যয় কমে যাচ্ছে।
অ্যালিসন কেম্পার ফেডারেল লিবারেল সরকারের কিছু অর্থনৈতিক পদক্ষেপের প্রশংসা করেছেন। বিশেষ করে বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং অর্থনীতিতে প্রণোদনা দেওয়ার নীতিকে তিনি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তবে তার মতে, শুধুমাত্র অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে দারিদ্র্য কমানো সম্ভব নয়। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসনের সংখ্যা বাড়ানো এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ। কারণ কানাডার বড় সংকটগুলোর একটি হয়ে উঠেছে আবাসন ব্যয়। তিনি বলেন, সরকারের উচিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে সুলভ মূল্যের আবাসন নির্মাণ বাড়ানো এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে আরও শক্তিশালী করা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে কানাডিয়ান পরিবার ও একক ব্যক্তিদের কর-পরবর্তী গড় আয় দাঁড়িয়েছে ৭৫ হাজার ৫০০ ডলার। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করার পর এটি ২০২৩ সালের তুলনায় সামান্য উন্নতি। ২০২৩ সালে একই আয় ছিল ৭৫ হাজার ১০০ ডলার। তবে ২০২০ সালের তুলনায় বাস্তব আয় এখনো ২ দশমিক ৫ শতাংশ কম। ২০২০ সালে গড় আয় ছিল ৭৭ হাজার ৪০০ ডলার। অর্থনীতিবিদদের মতে, নামমাত্র আয় বাড়লেও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। অর্থাৎ মানুষ আয় বেশি করলেও সেই অর্থ দিয়ে আগের মতো জীবনযাপন করতে পারছে না।
খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার পরিস্থিতিও এখনো উদ্বেগজনক। যদিও টানা তিন বছর বৃদ্ধির পর ২০২৪ সালে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রায় ২৪ শতাংশ কানাডিয়ান কোনো না কোনো মাত্রায় খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ছিলেন। সংখ্যার হিসেবে যা প্রায় ৯৮ লাখ মানুষ। তবে এটি ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার কম। বিশ্লেষকদের মতে, কিছু সরকারি সহায়তা কর্মসূচি এবং শ্রমবাজারে আংশিক উন্নতির কারণে এই সামান্য অগ্রগতি এসেছে। কিন্তু সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগের কারণ হয়ে রয়েছে।
৬৫ বছর ও তার বেশি বয়সী নাগরিকদের মধ্যে দারিদ্র্যের হার কিছুটা কমেছে। ২০২৪ সালে এই বয়সী জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্যের হার কমে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৪ শতাংশে, যা আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট কম। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সরকারি পেনশন ও সামাজিক সহায়তা কর্মসূচির কারণে প্রবীণদের একটি অংশ কিছুটা সুরক্ষা পাচ্ছেন। তবে স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় ও আবাসন সংকট ভবিষ্যতে তাদের জন্যও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
কানাডা দীর্ঘদিন ধরে উন্নত জীবনমানের দেশের তালিকায় শীর্ষে থাকলেও সাম্প্রতিক এই পরিসংখ্যান নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দারিদ্র্য কমানোর লড়াই আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, যদি আবাসন ব্যয়, খাদ্যমূল্য এবং জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে আগামী বছরগুলোতে মধ্যবিত্ত শ্রেণির বড় অংশও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যেতে পারে।



