সবার জন্য সমতা বিষয়ে কানাডিয়ানদের অবশ্যই সিদ্ধান্ত নিতে হবে

জামির হোসেন

রোববার আন্তর্জাতিক হোমোফোবিয়া, বাইফোবিয়া ও ট্রান্সফোবিয়া বিরোধী দিবস উপলক্ষে দেওয়া বক্তব্য ও সাক্ষাৎকারে দেশটির বিভিন্ন মানবাধিকারকর্মী এবং কুইয়ার সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

কানাডা কি মানবাধিকার ও বহুত্ববাদের আদর্শে অটল থাকবে, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের মতো রাজনৈতিক মেরুকরণের পথে হাঁটবে এই প্রশ্ন এখন দেশটির সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। বিশেষ করে এলজিবিটিকিউ+ সম্প্রদায়ের অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্কের প্রেক্ষাপটে অধিকারকর্মীরা বলছেন, কানাডা বর্তমানে এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।

রোববার আন্তর্জাতিক হোমোফোবিয়া, বাইফোবিয়া ও ট্রান্সফোবিয়া বিরোধী দিবস উপলক্ষে দেওয়া বক্তব্য ও সাক্ষাৎকারে দেশটির বিভিন্ন মানবাধিকারকর্মী এবং কুইয়ার সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাদের অভিযোগ, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তি, ঘৃণামূলক প্রচারণা এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ কুইয়ার ও ট্রান্সজেন্ডার জনগোষ্ঠীর জন্য ক্রমশ বৈরী পরিবেশ তৈরি করছে।

কুইয়ার অধিকারভিত্তিক সংগঠন ‘কুইয়ার মোমেন্টাম’-এর নির্বাহী পরিচালক ফায়ে জনস্টন বলেন, কানাডিয়ান সমাজকে এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কেমন রাষ্ট্র গঠন করতে চায়। তার মতে, একটি উন্মুক্ত, মানবিক ও সংলাপনির্ভর সমাজ গড়ে তুলতে হলে ঘৃণা ও বিভাজনের রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করা জরুরি।

হ্যালিফ্যাক্স থেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জনস্টন বলেন, “আমরা কি এমন একটি দেশ হব, যেখানে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও মানবাধিকার নিশ্চিত করা হবে? নাকি আমরা যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প-ধারার বিভাজনমূলক রাজনীতির দিকে এগিয়ে যাব?” তার এই মন্তব্য মূলত সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রবণতার প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী রাজনীতি বিভিন্ন দেশে যৌন ও লিঙ্গ বৈচিত্র্যের অধিকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে।

অধিকারকর্মীরা অভিযোগ করেন, কানাডার কিছু প্রাদেশিক সরকার ইতোমধ্যে এমন কিছু নীতি গ্রহণ করেছে, যা ট্রান্সজেন্ডার ও কুইয়ার ব্যক্তিদের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে স্কুলে জেন্ডার পরিচয় সংক্রান্ত নীতিমালা, স্বাস্থ্যসেবা এবং পরিচয় প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। তাদের মতে, এই পরিস্থিতিতে ফেডারেল সরকারের আরও দৃঢ় অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন ছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এখন পর্যন্ত বিষয়টিকে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেননি বলে অভিযোগ তুলেছেন আন্দোলনকারীরা।

ফায়ে জনস্টন বলেন, “প্রধানমন্ত্রী এই ইস্যুগুলোতে যথেষ্ট সময় ও মনোযোগ দিচ্ছেন না, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তিনি চাইলে অর্থনৈতিক ও সামাজিক দুই ধরনের সমস্যাই একসঙ্গে মোকাবিলা করতে পারেন।” তার বক্তব্যে স্পষ্ট যে, মানবাধিকার প্রশ্নকে শুধুমাত্র সামাজিক ইস্যু নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক অংশ হিসেবে দেখার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

এদিকে কানাডার লিবারেল সরকারের জেন্ডার ইকুয়ালিটি বিষয়ক মন্ত্রী রিচি ভালদেজ এক বিবৃতিতে বলেন, “প্রত্যেক কানাডিয়ানেরই নিরাপদ ও সুস্থ জীবনযাপনের অধিকার রয়েছে সে যেই হোক কিংবা যাকেই ভালোবাসুক না কেন।” তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক হোমোফোবিয়া, ট্রান্সফোবিয়া ও বাইফোবিয়া বিরোধী দিবস ঘৃণা, ভয় এবং পক্ষপাতমূলক মনোভাবের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।

মন্ত্রী ভালদেজের ভাষ্য অনুযায়ী, সমাজে বিদ্যমান নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও বৈষম্যমূলক আচরণ এখনও ২এসএলজিবিটিকিউআই+ জনগোষ্ঠীর জীবনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো ক্ষেত্রগুলোতে তারা এখনও নানা ধরনের বাধা ও বৈষম্যের মুখোমুখি হন।

কানাডা দীর্ঘদিন ধরেই বহুসংস্কৃতিবাদ, মানবাধিকার ও উদারনৈতিক মূল্যবোধের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেশটির অভ্যন্তরেও বিভাজন বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম-নির্ভর প্রচারণা, ভুল তথ্য এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

অধিকারকর্মীরা সতর্ক করে বলছেন, যদি রাজনৈতিক নেতৃত্ব স্পষ্টভাবে বৈষম্যবিরোধী অবস্থান না নেয়, তাহলে কুইয়ার ও ট্রান্স সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা আরও হুমকির মুখে পড়তে পারে। তাদের মতে, এখনই সময় কানাডার জন্য নিজেদের মূল্যবোধ পুনরায় স্পষ্ট করার তারা কি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের পথে থাকবে, নাকি বিভাজনের রাজনীতিকে প্রশ্রয় দেবে।

Related Articles

Back to top button