সরকারের প্রতি আস্থাবান অর্ধেক কানাডিয়ান

কামরুল ইসলাম

কানাডিয়ানদের বড় একটি অংশ নিজেদের দেশ, প্রদেশ ও বসবাসের শহরের প্রতি গভীর টান অনুভব করেন।

কানাডিয়ানদের বড় একটি অংশ নিজেদের দেশ, প্রদেশ ও বসবাসের শহরের প্রতি গভীর টান অনুভব করেন। তবে একই মাত্রার আস্থা তাঁরা প্রকাশ করতে পারেননি সরকারের প্রতি। লেজার পরিচালিত নতুন এক জনমত সমীক্ষায় উঠে এসেছে এমনই চিত্র।

চলতি বছরের ১৬ থেকে ১৮ মে পর্যন্ত পরিচালিত এই সমীক্ষায় ১,৫৩৭ জন কানাডিয়ান অংশ নেন। দেশজুড়ে জনমত ও সামাজিক অনুভূতির প্রবণতা যাচাই করতেই এই গবেষণা পরিচালিত হয়। এতে দেখা যায় কানাডার প্রতি নাগরিকদের আবেগ যথেষ্ট শক্তিশালী হলেও সরকারের প্রতি তাঁদের আস্থায় স্পষ্ট ঘাটতি রয়েছে।

সমীক্ষায় অংশ নেওয়া কানাডিয়ানদের মধ্যে ৮২ শতাংশই জানিয়েছেন যে তাঁরা দেশের প্রতি টান অনুভব করেন। ৪৬ শতাংশ বলেছেন, তাঁদের টান “খুব বেশি”। ৩৬ শতাংশ মানুষ জানান, তাঁরা “মোটামুটি” টান অনুভব করেন। অন্যদিকে ১২ শতাংশ নাগরিক দেশের প্রতি খুব বেশি টান অনুভব করেন না। আর ৪ শতাংশ একেবারেই কোনো টান অনুভব করেন না বলেও জানান।

এই পরিসংখ্যান দেখায়, সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিচয়ের স্তরে কানাডা এখনো নাগরিকদের আবেগের কেন্দ্রে অবস্থান করছে।

নিজ নিজ প্রদেশের প্রতি কানাডিয়ানদের টানও উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী। সমীক্ষা বলছে ৮০ শতাংশ অংশগ্রহণকারী তাঁদের প্রদেশের প্রতি টান অনুভব করেন। এর মধ্যে ৪২ শতাংশ “খুব বেশি” টান অনুভব করেন, এবং ৩৮ শতাংশ “কিছুটা” টান অনুভব করেন। তবে লক্ষণীয় যে, ১৪ শতাংশ জানান, তাঁরা প্রদেশের প্রতি কোনো টানই অনুভব করেন না।

এটি আঞ্চলিক পরিচয়ের ক্ষেত্রে দেশজুড়ে সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক মানসিকতার ইঙ্গিত দেয়, যদিও কিছু ক্ষেত্রে আঞ্চলিক দ্বিধা বা অসন্তুষ্টিও রয়েছে।

দেশ ও প্রদেশের তুলনায় নিজ শহর বা মিউনিসিপালিটির প্রতি টান অপেক্ষাকৃত কম মাত্র ৭১ শতাংশ কানাডিয়ান জানান যে তাঁরা তাঁদের শহরের প্রতি টান অনুভব করেন। এর মধ্যে ২৬ শতাংশ “খুব বেশি” টান অনুভব করেন, ৪৫ শতাংশ “মোটামুটি” টান অনুভব করেন। আর ২১ শতাংশ নিজেদের শহরের প্রতি কোনো টানই অনুভব করেন না বলে জানান। এটি বোঝায়, স্থানীয় পর্যায়ে নাগরিকদের সন্তুষ্টির মাত্রা দেশ বা প্রদেশের তুলনায় একটু কম।

সমীক্ষায় অঞ্চলভেদে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যায়। আলবার্টা: দেশের প্রতি টান সবচেয়ে কম। আলবার্টার বাসিন্দাদের মধ্যে ৭০ শতাংশ দেশের প্রতি টান অনুভব করেন, যা দেশের সকল প্রদেশের মধ্যে সর্বনিম্ন। প্রদেশের প্রতি টান প্রকাশ করেছেন ৭৩ শতাংশ। আর মিউনিসিপালিটির প্রতি টান জানিয়েছেন মাত্র ৬৪ শতাংশ।

রাজনৈতিক চাপ, ফেডারেল সরকারের প্রতি অসন্তোষ এবং প্রাদেশিক পরিচয়ের দৃঢ়তা এসব কারণ এখানে প্রভাব ফেলেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

অন্টারিওর বাসিন্দারা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি ইতিবাচক ৮৬ শতাংশ দেশের প্রতি টান অনুভব করেন, যা সমীক্ষার সর্বোচ্চ হার। প্রদেশের প্রতি টান ৮০ শতাংশ। মিউনিসিপালিটির প্রতি টান প্রকাশ করেছেন ৭২ শতাংশ। দেশের অর্থনীতি, সামাজিক সেবা এবং বহুসাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের কারণে অন্টারিওবাসীদের এই উচ্চ মাত্রার সংযুক্তি স্বাভাবিক বলে মনে করছেন গবেষকেরা।

সমীক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কানাডিয়ানদের নিজেদের সরকারের প্রতি আস্থা কমে গেছে। মোট অংশগ্রহণকারীর মাত্র প্রায় ৫০ শতাংশ সরকারে আস্থা প্রকাশ করেছেন। এটি দেখায় যে, দেশ ও সমাজের প্রতি আবেগীয় সংযোগ থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনের প্রতি নাগরিকদের অনিশ্চয়তা বাড়ছে। গবেষণা বলছে, রাজনৈতিক অস্থিরতা, জলবায়ু নীতি নিয়ে বিতর্ক, অর্থনৈতিক চাপ এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ এই আস্থাহীনতার অন্যতম কারণ।

লেজারের এই সমীক্ষা তুলে ধরেছে দ্বৈত বাস্তবতা একদিকে কানাডিয়ানরা দেশ, প্রদেশ এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের প্রতি টান অনুভব করেন; অন্যদিকে সরকারের প্রতি তাঁদের আস্থা কমছে। নাগরিক-রাষ্ট্র সম্পর্কের এই ফারাক নীতি-নির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

Related Articles

Back to top button