অপরাধের তীব্রতা সূচক ৪% হ্রাস, তিন বছরের ধারাবাহিক বৃদ্ধির পর প্রথমবার নিম্নগামী প্রবণতা

আনাস মোহাম্মদ

চুরি, সম্পদ নষ্ট, জালিয়াতি এবং মাদক–সম্পর্কিত অপরাধে উল্লেখযোগ্য হ্রাস এই প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করেছে।

স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার সদ্য প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ২০২৪ সালে দেশজুড়ে পুলিশে রিপোর্ট হওয়া অপরাধের সামগ্রিক পরিমাণ ও তীব্রতা সূচক গত তিন বছরের ধারাবাহিক বৃদ্ধির পর প্রথমবারের মতো উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৪ সালের হিসেবে অপরাধের তীব্রতা সূচক গত বছরের তুলনায় গড়ে ৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পতন কানাডার সাম্প্রতিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ইতিবাচক প্রতিফলন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, অপরাধ হ্রাসের প্রধান কারণ হলো অসহিংস অপরাধের কমে আসা। ২০২৪ সালে নন–ভায়োলেন্ট সিএসআই বা অসহিংস অপরাধের তীব্রতা সূচক ৬ শতাংশ কমেছে, যা একটি বড় ধরনের সাফল্য।

চুরি, সম্পদ নষ্ট, জালিয়াতি এবং মাদক–সম্পর্কিত অপরাধে উল্লেখযোগ্য হ্রাস এই প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করেছে। ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে যেখানে অসহিংস অপরাধের সিএসআই ৯ শতাংশ বেড়েছিল, সেখানে ২০২৪ সালের এই পতন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও নীতিনির্ধারকদের স্বস্তি এনে দিয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, মহামারির পর অর্থনীতি ও সমাজে যে চাপ তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটাই কমে এসেছে। এর ফলে সম্পত্তি–সংক্রান্ত অপরাধ, বিশেষ করে মাদক পাচার ও চুরি, স্বাভাবিক স্তরে ফিরেছে।

তবে সব দিক একেবারে ইতিবাচক নয়। ভায়োলেন্ট সিএসআই, অর্থাৎ সহিংস অপরাধের তীব্রতা সূচক ২০২৪ সালে ১ শতাংশ বেড়েছে। গার্হস্থ্য সহিংসতা, গুরুতর হামলা এবং সাইবার–সম্পর্কিত হুমকি বৃদ্ধিকে এর মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

যদিও এই বৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে সীমিত, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে দেখছে। উল্লেখযোগ্য যে, ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে সহিংস অপরাধের সিএসআই  প্রায় ১৫ শতাংশ বেড়েছিল, যা জননিরাপত্তা নিয়ে তীব্র উদ্বেগ তৈরি করেছিল।

অপরাধের তীব্রতা সূচক বা সিএসআই কেবল অপরাধের সংখ্যা গণনা করে না; এটি অপরাধের ধরন ও গুরুতরতার ভিত্তিতে ওজন নির্ধারণ করে। অর্থাৎ, বড় ধরনের সহিংস বা সংগঠিত অপরাধের হার কমলে সিএসআই–ও কমে। ফলে ২০২৪ সালের এই ৪ শতাংশ পতন শুধু অপরাধের পরিমাণ হ্রাস নয়, বরং গুরুতর অপরাধ নিয়ন্ত্রণেরও ইঙ্গিত দিচ্ছে।

প্রাদেশিক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, সাসকাচুয়ান ও ম্যানিটোবায় সিএসআই এখনও জাতীয় গড়ের উপরে রয়েছে। তবে সেখানেও সামান্য হ্রাস লক্ষ্য করা গেছে। অপরদিকে অন্টারিও ও কুইবেক প্রদেশ অপরাধ কমানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অগ্রগতি দেখিয়েছে।

শহরভিত্তিক বিশ্লেষণে টরন্টো, ভ্যাঙ্কুভার এবং মন্ট্রিয়লে সম্পত্তি–সংক্রান্ত অপরাধ কমলেও গ্যাং–সম্পর্কিত সহিংসতা এখনও উদ্বেগের কারণ হয়ে রয়েছে। বিশেষ করে বড় শহরগুলোতে গ্যাং–সংঘাত এবং অস্ত্র সহিংসতার ঝুঁকি মোকাবিলায় নতুন কৌশল গ্রহণের তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

স্ট্যাটিস্টিকস কানাডা জানিয়েছে, সম্প্রদায়ভিত্তিক পুলিশি কার্যক্রম, প্রমাণভিত্তিক অপরাধ প্রতিরোধ কর্মসূচি এবং সামাজিক সেবার বিস্তার এই ইতিবাচক পরিবর্তনে বড় ভূমিকা রেখেছে।

বিশেষ করে ইয়ুথ ক্রাইম প্রিভেনশন প্রোগ্রাম এবং কমিউনিটি সাপোর্ট ইনিশিয়েটিভ তরুণদের অপরাধ থেকে দূরে রাখতে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। স্কুলভিত্তিক সচেতনতা কার্যক্রম এবং পুনর্বাসন–কেন্দ্রিক সহায়তাও অপরাধ হ্রাসে সহায়ক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো আশাবাদী যে, অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে এই ইতিবাচক ধারা ২০২৫ সালেও অব্যাহত থাকবে। তবে সাইবার অপরাধ ও অনলাইন প্রতারণা দ্রুত বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নতুন প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ এবং উন্নত নজরদারির ওপর বিনিয়োগ অত্যন্ত জরুরি।

Related Articles

Back to top button