কানাডায় ভোটার হওয়ার বয়স ১৬ করার দাবি জোরালো

লিয়াকত আলী

ব্রিটিশ সরকারের সাম্প্রতিক ঘোষণা ভোটার হওয়ার ন্যূনতম বয়স ১৮ থেকে কমিয়ে ১৬ করার পরিকল্পনা কানাডার রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক ও উত্তেজনা তৈরি করেছে।

ব্রিটিশ সরকারের সাম্প্রতিক ঘোষণা ভোটার হওয়ার ন্যূনতম বয়স ১৮ থেকে কমিয়ে ১৬ করার পরিকল্পনা কানাডার রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক ও উত্তেজনা তৈরি করেছে। গণতন্ত্রকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে এবং তরুণদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করতে এই পদক্ষেপের প্রস্তাব যুক্তরাজ্যে যেমন সাড়া ফেলেছে, তেমনি কানাডাতেও জোরদার হয়েছে একই দাবি।

কানাডিয়ান সেনেটর মারিলো ম্যাকফেডরান দীর্ঘদিন ধরেই ভোটার বয়স কমানোর পক্ষে সোচ্চার। রেড চেম্বারে যোগ দেওয়ার পর থেকে তিনি এই ইস্যুকে তাঁর অন্যতম প্রধান সংসদীয় অগ্রাধিকার হিসেবে রেখেছেন। ব্রিটেনের ঘোষণার পর এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “কানাডার সামনে একই কাজ করার সময় পেরিয়ে গেছে। তরুণদের রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর শোনার এখনই সঠিক সময়।”

ম্যাকফেডরানের মতে, ভোটার হওয়ার বয়স ১৬ করলে তরুণদের ক্ষমতায়ন হবে এবং কানাডার গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হবে। তিনি যুক্তি দেন, তরুণরা ইতিমধ্যেই দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ১৬ বছর বয়সী কানাডিয়ান কোনো না কোনোভাবে কর্মসংস্থানে রয়েছে এবং কর প্রদান করছে। তাঁর বক্তব্য, “যারা সমাজে অবদান রাখছে, তাদের গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ থেকে বঞ্চিত রাখা ন্যায়সঙ্গত নয়।”

এই প্রস্তাবে সমর্থন জানিয়েছে তরুণদের নেতৃত্বাধীন সংগঠন ইয়ং পলিটিশিয়ান্স অব কানাডা। সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ১৬ বছর বয়সী জ্যাডেন ব্রেভস বলেন, “আমাদের আর অন্য দেশের ছায়ায় থাকতে হবে না। কানাডাকে নেতৃত্ব দিতে হবে। আমরা এমন একটি দেশ হতে পারি না, যে সবসময় অপেক্ষা করে অন্যরা কী করছে তা দেখার জন্য।”

ব্রেভস আক্ষেপ করে জানান, গত ২০ বছরে ভোটার বয়স কমানোর জন্য একাধিক বিল উত্থাপিত হলেও কোনোটি পাস হয়নি। তাঁদের মতে, নতুন প্রজন্মকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ও নীতি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

ম্যাকফেডরান চলতি বছরের মে মাসের শেষে সেনেটে একটি নতুন বিল উত্থাপন করেন। পরিকল্পনা ছিল সেপ্টেম্বরে সংসদ অধিবেশন শুরু হলে বিলটি পুনরায় উপস্থাপন করবেন। তবে সাম্প্রতিক সংসদ স্থগিতের কারণে এই বিলের অগ্রগতি আপাতত থমকে গেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সংসদ পুনরায় কার্যক্রম শুরু হলে বিষয়টি পুনরায় আলোচনায় আসবে।

কানাডা সর্বশেষ ১৯৭০ সালে ভোটার বয়স ২১ থেকে কমিয়ে ১৮ করে। এর আগে ব্রিটেন ১৯৬৯ সালে একই পদক্ষেপ নেয়, যা পরে বিশ্বের অনেক গণতান্ত্রিক দেশ অনুসরণ করে। বর্তমানে স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসে স্থানীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার বয়স ১৬ এবং জাতীয় নির্বাচনে ১৭ বছর। ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া ও ইকুয়েডরের মতো দেশও ইতিমধ্যেই ১৬ বছর বয়সীদের ভোটাধিকার দিয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে প্রায় ১০ লাখ নতুন ভোটার নির্বাচনী তালিকায় যুক্ত হবে। এর ফলে রাজনৈতিক দলগুলোকে তরুণ ভোটারদের প্রতি আরও মনোযোগী হতে হবে। শিক্ষানীতি, পরিবেশ, প্রযুক্তি এবং ডিজিটাল অধিকার নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে দলগুলোকে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, তরুণদের ভোটাধিকার নিশ্চিত হলে নীতি নির্ধারণে নতুন মাত্রা যোগ হবে এবং সমাজের নানা ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

তবে বিরোধী মতও কম নয়। সমালোচকদের মতে, ১৬ বছর বয়সী কিশোররা এখনও পূর্ণ রাজনৈতিক পরিপক্বতা অর্জন করেনি এবং স্কুলপড়ুয়া হওয়ায় রাজনৈতিক প্রচারণার প্রভাবের প্রতি তারা বেশি সংবেদনশীল হতে পারে। তাঁদের মতে, ভোটের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার বয়স ১৮-ই উপযুক্ত।

কানাডার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা নিয়ে এই বিতর্ক নতুন নয়, তবে ব্রিটেনের সাম্প্রতিক ঘোষণার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এখন দেখার বিষয়, ম্যাকফেডরানের প্রস্তাবিত বিল সংসদে কীভাবে অগ্রসর হয় এবং কানাডা কি শেষ পর্যন্ত ভোটার হওয়ার বয়স ১৬তে নামিয়ে গণতন্ত্রে আরও তরুণ কণ্ঠস্বরের পথ খুলে দেয়।

Related Articles

Back to top button