টিটিসির ভাড়া পরিদর্শকদের নতুন নাম ও বাড়তি কড়াকড়ি: ‘প্রভিন্সিয়াল অফেন্সেস অফিসার’

জুমু চৌধুরী

টরন্টো শহরের গণপরিবহন ব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্র টরন্টো ট্রানজিট কমিশন (টিটিসি) ভাড়া ফাঁকি রোধে নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে।

টরন্টো শহরের গণপরিবহন ব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্র টরন্টো ট্রানজিট কমিশন (টিটিসি) ভাড়া ফাঁকি রোধে নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে। এবার থেকে টিটিসির ভাড়া পরিদর্শকরা আর শুধু সাধারণ পরিদর্শক নন, তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচিত করা হয়েছে ‘প্রভিন্সিয়াল অফেন্সেস অফিসার’ হিসেবে। রোববার থেকে কার্যকর হওয়া এই পরিবর্তনকে টিটিসি শুধু নাম বদল নয়, বরং আর্থিক ক্ষতি কমানো ও যাত্রীদের মধ্যে জবাবদিহিতা বাড়ানোর একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে।

২০১৯ সালে টরন্টো অডিটর জেনারেলের এক প্রতিবেদনে প্রথম বিষয়টি আলোচনায় আসে। সেই প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল টিটিসিতে ভাড়া ফাঁকি দেওয়ার হার ৫.৪ শতাংশ, যা কেবল ২০১৮ সালেই সংস্থাটির প্রায় ৬ কোটি ১০ লাখ ডলার রাজস্ব ক্ষতি করে। প্রতিবেদনে স্পষ্ট করে বলা হয়েছিল, কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা থাকলে যাত্রীরা ন্যায্য ভাড়া প্রদানে বেশি সচেতন হবেন।

কিন্তু পরবর্তী কয়েক বছরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। টিটিসির সর্বশেষ নিরীক্ষা অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ভাড়া ফাঁকি থেকে প্রায় ১৪ কোটি ডলার ক্ষতি হয়েছে যা ২০১৮ সালের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। একদিকে কোভিড-পরবর্তী সময়ে টিটিসি এখনও যাত্রী সংখ্যা পুনরুদ্ধারে সংগ্রাম করছে, অন্যদিকে ভাড়া ফাঁকির এই প্রবণতা তাদের আর্থিক ভিত্তিকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

‘প্রভিন্সিয়াল অফেন্সেস অফিসার’ নামে পরিচিত এই কর্মকর্তারা মূলত আগের মতোই কাজ করবেন অর্থাৎ ভাড়া না দেওয়া বা নিয়ম ভঙ্গকারী যাত্রীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। তবে এবার তাদের জন্য নতুন ইউনিফর্ম নির্ধারণ করা হয়েছে ধূসর শার্ট ও ভেস্ট, যাতে তারা যাত্রীদের কাছে সহজে চেনা যায়।

তারা ভাড়া ফাঁকি ধরা পড়লে ২৪৫ থেকে ৪২৫ ডলার পর্যন্ত জরিমানা দিতে বাধ্য করবেন যাত্রীদের। টিটিসির মতে, এটি শুধু শাস্তি নয়, বরং যাত্রীদের মধ্যে ন্যায্য ভাড়া দেওয়ার প্রবণতা বাড়ানোর একটি কার্যকর মাধ্যম।

টিটিসি পরিচালনার খরচে ফেডারেল, প্রাদেশিক ও সিটি সরকার ভর্তুকি দিলেও সংস্থাটির মোট বাজেটের প্রায় ৪২ শতাংশ আসে যাত্রীদের ভাড়া থেকে। অন্টারিওর অন্য কোনো পরিবহন সংস্থায় এই অনুপাত এত বেশি নয়। ফলে ভাড়া ফাঁকি দেওয়া মানে সরাসরি টিটিসির সেবা কমে যাওয়া, ভাড়া বৃদ্ধি পাওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদে যাত্রীদেরই বাড়তি চাপের মুখে পড়া।

টিটিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মানদীপ এস. লালি এ প্রসঙ্গে বলেন “গ্রাহকদের মনে রাখা উচিত, ভাড়া না দেওয়া মানে আমাদের সেবার মান উন্নয়নে বাধা দেওয়া এবং ভাড়া স্থিতিশীল রাখার সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করা। প্রভিন্সিয়াল অফেন্সেস অফিসারে রূপান্তর কেবল একটি নাম পরিবর্তন নয়, এটি ভাড়া প্রদানে সকলকে জবাবদিহিতার মধ্যে আনতে আমাদের প্রতিশ্রুতির অংশ।”

ভাড়া ফাঁকি রোধে টিটিসি আগেও বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছিল। এর মধ্যে রয়েছে স্টেশনগুলোতে স্বয়ংক্রিয় ফেয়ার গেট স্থাপন, ক্যামেরা নজরদারি ব্যবস্থা এবং ভাড়া দেওয়ার গুরুত্ব নিয়ে প্রচারণা।

কিন্তু এই সব প্রযুক্তিগত পদক্ষেপের পরও লোকসান বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এর মূল কারণ হলো মানবিক তদারকির অভাব। অনেক যাত্রী মনে করেন, ধরা পড়ার ঝুঁকি কম থাকায় ভাড়া না দেওয়া সহজ উপায়। তাই দৃশ্যমান উপস্থিতি তৈরি করতে মাঠপর্যায়ে সক্রিয় অফিসারদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

টরন্টো শহরের জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, জীবনযাত্রার খরচও ক্রমাগত বাড়ছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে গণপরিবহন ব্যবস্থার ওপর চাপ। এ পরিস্থিতিতে ন্যায্য ভাড়া প্রদান শুধু টিটিসির আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য নয়, বরং গোটা শহরের পরিবহন ব্যবস্থার টেকসই উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ভাড়া ফাঁকি রোধ করা গেলে শুধু টিটিসির সেবা মান বজায় থাকবে না, বরং ভবিষ্যতে যাত্রীদের ওপর ভাড়া বাড়ানোর চাপও কমবে।

Related Articles

Back to top button