কানাডা–যুক্তরাষ্ট্র সীমান্তে ১৩ মিলিয়ন ডলারের মাদক পাচারের দায়ে টরন্টোর ব্যক্তিকে ১৬ বছরের কারাদণ্ড

আনাস মোহাম্মদ

কানাডা–যুক্তরাষ্ট্র সীমান্ত পেরিয়ে বিপুল পরিমাণ কোকেন ও ক্রিস্টাল মেথ পাচারের অভিযোগে টরন্টোর ৩২ বছর বয়সী মার্ভিন ওয়াটসনকে ১৬ বছরের কঠোর কারাদণ্ড দিয়েছেন কানাডার একটি আদালত।

কানাডা–যুক্তরাষ্ট্র সীমান্ত পেরিয়ে বিপুল পরিমাণ কোকেন ও ক্রিস্টাল মেথ পাচারের অভিযোগে টরন্টোর ৩২ বছর বয়সী মার্ভিন ওয়াটসনকে ১৬ বছরের কঠোর কারাদণ্ড দিয়েছেন কানাডার একটি আদালত। মামলাটিকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সীমান্ত অতিক্রমী মাদক চক্রের বিরুদ্ধে অন্যতম বড় রায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ঘটনার সূত্রপাত ২০২৩ সালের মার্চে। কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সির (সিবিএসএ) কর্মকর্তারা উইন্ডসরের অ্যাম্বাসাডর ব্রিজ সীমান্তে প্রবেশ করা একটি পরিবহন ট্রাকে নিয়মিত চেকের অংশ হিসেবে সেকেন্ডারি পরিদর্শন চালান। ওই তল্লাশিতে পাওয়া যায় প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ডলারের সমমূল্যের উচ্চমানের কোকেন ও ক্রিস্টাল মেথামফেটামিন।

পরবর্তীতে রয়্যাল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশ (আরসিএমপি) জানায়, চালকের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। তিনি মাদকের অস্তিত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিলেন। প্রায় তিন সপ্তাহ আটক থাকার পর আদালত তাকে নির্দোষ ঘোষণা করে মুক্তি দেয়। তদন্তে স্পষ্ট হয়, পুরো পরিকল্পনার মূল নায়ক ওয়াটসন এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী মারিয়া কিগুরু।

তদন্তে বেরিয়ে আসে, ওয়াটসন একাধিকবার সীমান্ত পার হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাঠানোর চেষ্টা করেন। এজন্য তিনি একটি ট্রাকিং কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। তবে পরিকল্পনা ভেস্তে যায় চালক আটক হওয়ার পর।

এর কিছুদিন পর আরেকটি বড় অভিযান চালানো হয় ওয়াটসনের টরন্টো বাড়ির সামনে। একটি ভ্যানে ঢোকার সময় তাকে আটক করে পুলিশ। তল্লাশিতে উদ্ধার হয় ১২০ কিলোগ্রাম কোকেন। পুলিশ মনে করে, এটি ওয়াটসনের আন্তর্জাতিক পাচার নেটওয়ার্কের অংশ, যা কানাডা থেকে নিয়মিত যুক্তরাষ্ট্রে চালান পাঠাত।

পাঁচটি অভিযোগে দোষ স্বীকার করার পর ওয়াটসনকে ১৬ বছরের সাজা দেন বিচারক। অভিযোগগুলোর মধ্যে ছিল বিপুল পরিমাণ কোকেন ও মেথামফেটামিন অবৈধভাবে রাখা, সীমান্ত অতিক্রম করে পাচারের পরিকল্পনা, ট্রাকিং নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে চালান পাঠানোর চেষ্টা, আদালত রায়ে মন্তব্য করেন, “এই ধরনের অপরাধ কেবল সীমান্ত নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে না, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্যও মারাত্মক বিপদ তৈরি করে।”

কানাডার নগরীগুলোতে কোকেন ও ক্রিস্টাল মেথের সহজলভ্যতা সামাজিক সমস্যাকে বাড়িয়ে তুলছে, যা স্বাস্থ্যসেবা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

ওয়াটসনের সহযোগী মারিয়া কিগুরুর বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্তকারীরা প্রমাণ পেয়েছেন যে, তিনি সরাসরি পাচার চক্রে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন। শুধু কোকেন বা মেথ নয়, আরও অন্যান্য অবৈধ মাদকের সরবরাহ নেটওয়ার্কেও তিনি যুক্ত ছিলেন। তার বিচার এখনো চলমান।

এই মামলার পর সিবিএসএ ও আরসিএমপি ঘোষণা করেছে, সীমান্ত চেকপয়েন্টগুলোতে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার, ঝুঁকি নির্ধারণ প্রক্রিয়া জোরদার এবং পরিবহন ব্যবসায় যুক্ত কোম্পানিগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি আরোপ করা হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতে, আন্তর্জাতিক মাদক পাচার নেটওয়ার্ক ভাঙতে হলে শুধু সীমান্ত নজরদারি নয়, বরং কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানও বাড়ানো প্রয়োজন।

আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ওয়াটসনের ১৬ বছরের কারাদণ্ড সীমান্ত অতিক্রমী অপরাধ দমনে একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। এর মাধ্যমে আদালত স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, মাদক পাচারের মতো গুরুতর অপরাধে কোনো প্রকার নমনীয়তা দেখানো হবে না।

এই রায় শুধু ওয়াটসন ও তার চক্রের জন্য নয়, বরং পুরো আন্তর্জাতিক মাদক পাচার নেটওয়ার্কের জন্য সতর্কবার্তা। সীমান্তকে ঘিরে কঠোর তদারকি এবং আন্তঃদেশীয় সহযোগিতা ছাড়া এমন অপরাধ দমন করা সম্ভব নয় এই মামলাটি সেই বাস্তবতাই নতুন করে সামনে আনলো।

Related Articles

Back to top button