দ্বিতীয় প্রান্তিকে কানাডিয়ান অর্থনীতির ১.৬% সংকোচন

মুসা বিশ্বাস

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি শুল্কের চাপে ২০২৫ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে কানাডার অর্থনীতি উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি শুল্কের চাপে ২০২৫ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে কানাডার অর্থনীতি উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়েছে। শুক্রবার প্রকাশিত স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে কানাডার মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) বার্ষিকভিত্তিতে ১ দশমিক ৬ শতাংশ কমে গেছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সংকোচনের প্রধান কারণ হলো রপ্তানি ও বিনিয়োগের তীব্র পতন। বছরের প্রথম প্রান্তিকে কানাডার অর্থনীতি যেখানে ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছিল, সেখানে দ্বিতীয় প্রান্তিকের এই পতন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উল্লেখ্য, প্রথমে এই প্রবৃদ্ধির প্রাথমিক হিসাব ধরা হয়েছিল ২ দশমিক ২ শতাংশ, যা পরে সংশোধন করে ২ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়।

স্ট্যাটিস্টিকস কানাডা জানায়, দ্বিতীয় প্রান্তিকে জনপ্রতি প্রকৃত জিডিপিও কমে গেছে, যদিও প্রথম প্রান্তিকে তা বৃদ্ধি পেয়েছিল। অর্থাৎ, সাধারণ কানাডিয়ানদের আয় ও উৎপাদনশীলতার ক্ষেত্রেও চাপ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

অর্থনৈতিক এই ধসের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি। দ্বিতীয় প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্র ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও অটোমোবাইল খাতে কানাডা ও বিশ্বের অন্যান্য দেশের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করে। ফলে কানাডার রপ্তানি খাত সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

অর্থনীতিবিদরা আগেই সতর্ক করেছিলেন, দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি শ্লথ হতে পারে। কারণ, ব্যবসায়ীরা শুল্ক আরোপের আশঙ্কায় বছরের শুরুতেই ব্যাপক ক্রয়াদেশ সম্পন্ন করেছিলেন, যা প্রথম প্রান্তিকের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ালেও দ্বিতীয় প্রান্তিকে তার বিপরীত প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

দ্বিতীয় প্রান্তিকে কানাডার রপ্তানি খাতে ব্যাপক পতন ঘটে। যাত্রীবাহী গাড়ি ও লাইট ট্রাকের রপ্তানি কমেছে ২৪ দশমিক ৭ শতাংশ। শিল্প যন্ত্রপাতি, ইকুইপমেন্ট ও যন্ত্রাংশের রপ্তানিও হ্রাস পেয়েছে। পাশাপাশি ভ্রমণ সেবা খাতেও পতন লক্ষ্য করা গেছে।

এই রপ্তানি হ্রাস কানাডার উৎপাদন খাতের ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশাধিকার কঠিন হয়ে পড়ায় কানাডিয়ান কোম্পানিগুলো বিকল্প বাজার খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দ্বিতীয় প্রান্তিকে যন্ত্রপাতি ও ইকুইপমেন্টে বিনিয়োগ কমেছে ৯ দশমিক ৪ শতাংশ, যা ২০১৬ সালের পর সবচেয়ে বড় পতন। যদিও এখানে কোভিড-১৯ মহামারিকালীন পরিস্থিতি হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছে।

এই বিনিয়োগ হ্রাস ইঙ্গিত দেয়, কানাডার ব্যবসায়িক আস্থা কমে গেছে এবং উৎপাদন সম্প্রসারণের পরিকল্পনাগুলো আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে।

দ্বিতীয় প্রান্তিকে আমদানিও হ্রাস পেয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অটোয়া যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পাল্টা শুল্ক আরোপ করায় মার্কিন কোম্পানিগুলো কানাডায় পণ্য রপ্তানিতে অনাগ্রহী হয়ে উঠেছে। ফলে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য যুদ্ধের উত্তেজনা বাড়ছে। তাছাড়া, এই সময় কানাডিয়ানদের যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণও কমেছে, যা পরোক্ষভাবে সেবা রপ্তানির পতনে ভূমিকা রেখেছে।

স্ট্যাটিস্টিকস কানাডা আরও জানায়, জুন মাসে প্রকৃত জিডিপি ০.১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যদিও প্রাথমিকভাবে ০.১ শতাংশ প্রবৃদ্ধির আশা করা হয়েছিল। পণ্য উৎপাদন খাতে প্রবৃদ্ধি কমেছে ০.৫ শতাংশ। সেবা খাতেও পতন ঘটেছে ০.১ শতাংশ। সামনের পথ অনিশ্চিত

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, যদি মার্কিন শুল্কনীতি বহাল থাকে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়, তবে কানাডার অর্থনীতি আগামী প্রান্তিকগুলোতেও চাপের মুখে পড়বে। তবে, যদি সরকার ব্যবসা ও রপ্তানিখাতে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে শুল্ক ইস্যু সমাধান করতে পারে, তাহলে পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা রয়েছে।

দ্বিতীয় প্রান্তিকে কানাডার অর্থনীতি ১.৬% হ্রাস, রপ্তানি ও বিনিয়োগে বড় ধাক্কা, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক ও পাল্টা শুল্কে উত্তপ্ত বাণিজ্য সম্পর্ক সব মিলিয়ে কানাডার অর্থনীতির জন্য সময়টা নিঃসন্দেহে কঠিন এক অধ্যায়।

Related Articles

Back to top button