দীর্ঘমেয়াদে বড় বিনিয়োগের ঘোষণা কার্নির

আলী আহমেদ

দীর্ঘমেয়াদি ও বড় বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বুধবার বাজেট-পূর্ব ভাষণে দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ও বড় বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছেন। একইসঙ্গে তিনি কানাডিয়ানদের সতর্ক করে বলেছেন, “অর্থনৈতিক রূপান্তর” ঘটাতে হলে কিছু ত্যাগ স্বীকার করতে হবে।

অটোয়ায় একদল শিক্ষার্থীর সামনে দেওয়া বক্তৃতায় কার্নি বলেন, “এটা আমাদের দেশ। এটা আমাদের ভবিষ্যৎ। আর এখন আমি সেটি আপনাদের ফিরিয়ে দিতে যাচ্ছি।”

এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি কানাডার অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ গঠনে নাগরিকদের অংশগ্রহণ ও দায়িত্ববোধের ওপর জোর দেন।

প্রধানমন্ত্রী জানান, আগামী ৪ নভেম্বর হাউস অব কমন্সে উপস্থাপন করা হবে নতুন বাজেট, যা হবে একযোগে কৃচ্ছতাসাধন ও বিনিয়োগমুখী বাজেট। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে কার্নি সরকার বাজেটের ব্যয় এবং সম্ভাব্য বিনিয়োগ পরিকল্পনা পুনর্মূল্যায়ন করছে। বাজেটে মূলত নতুন অর্থনৈতিক পরিকল্পনাগুলো অন্তর্ভুক্ত হবে।

তিনি বলেন, “আমরা একই সঙ্গে কম খরচে বেশি বিনিয়োগের উপায় খুঁজছি এটাই আমাদের নতুন দিকনির্দেশ।”

কার্নি সরকারের এই নতুন অর্থনৈতিক পরিকল্পনা কয়েকটি বড় লক্ষ্য সামনে রেখে তৈরি করা হচ্ছে – ১) বাণিজ্য অংশীদারিত্বে বৈচিত্র্য আনা – বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে নতুন বাজার তৈরি করা, ২) নতুন অভিবাসন পরিকল্পনা – দক্ষ ও তরুণ প্রতিভা আকৃষ্ট করার কৌশল, ৩) জলবায়ু প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি – সবুজ অর্থনীতি ও টেকসই শিল্পে বিনিয়োগ।

এই পরিকল্পনাগুলোর উদ্দেশ্য, কানাডাকে এমন একটি “উচ্চ দক্ষতা ও স্থিতিশীল অর্থনীতি” হিসেবে গড়ে তোলা যা বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে কার্নি কানাডার বাণিজ্য বাজারে বৈচিত্র্য আনার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আন্তর্জাতিক সফরে সক্রিয় রয়েছেন। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলায় চীন ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছেন।

কার্নি তার বক্তৃতায় বলেন, “আগামী এক দশকে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের বাজারে কানাডার রপ্তানি দ্বিগুণ করা হবে।” তার হিসাব অনুযায়ী, এই পদক্ষেপের ফলে বাণিজ্য থেকে ৩০ হাজার কোটি ডলার অতিরিক্ত রাজস্ব আসবে, যা দেশের প্রযুক্তি, সম্পদ ও দক্ষতা বিকাশে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে।

কার্নি তার প্রাক-বাজেট ভাষণে আরও জানান, আসন্ন বাজেটে থাকবে নতুন অভিবাসন পরিকল্পনা ও বিশ্বমানের প্রতিভা আকৃষ্ট করার কৌশল। সম্প্রতি শিল্পমন্ত্রী মেলানি জোলি তার নতুন শিল্প কৌশলে এই বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন, যা কার্নির সামগ্রিক অর্থনৈতিক রূপরেখার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বর্তমানে লিবারেল পার্টির সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে তিনটি আসন কম রয়েছে। ফলে বাজেট পাস করতে হলে সরকারের প্রয়োজন হবে অন্যান্য দলের এমপিদের সমর্থন। এই সমর্থন না পেলে সরকারের পতন ঘটতে পারে এবং কানাডাকে আবারও নির্বাচনের মুখোমুখি হতে হবে।

এ কারণে কার্নি সম্প্রতি বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক শুরু করেছেন। এনডিপির অন্তর্বর্তী নেতা ডন ডেভিস, ব্লক কুইবেকোয়িস নেতা ইভস-ফ্রাসোয়াঁ ব্লাশে এবং কনজার্ভেটিভ নেতা পিয়েরে পয়লিয়েভর এই তিন নেতার সঙ্গেই তিনি পৃথক বৈঠক করেছেন, যেখানে বাজেট অনুমোদন নিশ্চিত করার কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্ক কার্নির এই বাজেট হবে “রূপান্তরমূলক বাজেট” যা কানাডার অর্থনীতিকে শুধু পুনরুজ্জীবিত করবে না, বরং দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের ভিত্তি স্থাপন করবে। তবে, তিনি যেভাবে “ত্যাগ স্বীকারের” কথা বলেছেন, তা স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে জনগণকে কিছু কঠিন সময় পার করতে হতে পারে বিশেষত কর কাঠামো, ভর্তুকি বা সরকারি ব্যয় সংকোচনের ক্ষেত্রে।

বাজেট পেশের আগেই প্রধানমন্ত্রী কার্নি দেশের অর্থনৈতিক দিকনির্দেশ স্পষ্ট করে দিলেন। তার বার্তা পরিষ্কার অর্থনীতি বদলাবে, কিন্তু তার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে সবার। আগামী ৪ নভেম্বরের বাজেটই দেখাবে, কার্নির এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা কতটা বাস্তবায়নযোগ্য এবং রাজনৈতিকভাবে কতটা টেকসই।

Related Articles

Back to top button