ধর্মের প্রতি বিশ্বাস ফিরিয়ে আনছে জেন জিরা

মাহবুবুল আলম

কানাডায় দীর্ঘদিন পর ধর্মীয় প্রার্থনায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এমনই দাবি করেছেন দেশটির একাধিক চার্চ নেতা।

কানাডায় দীর্ঘদিন পর ধর্মীয় প্রার্থনায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এমনই দাবি করেছেন দেশটির একাধিক চার্চ নেতা। তাদের মতে, এ প্রবণতার মূল নায়ক জেনারেশন জি (Gen Z), অর্থাৎ ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণরা।

টরন্টোভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক শিক্ষাদাতা ও পুরস্কারজয়ী বক্তা ক্যালিসা এনগোজি জানান, কানাডার নানা শহরে একটি দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। তরুণদের মধ্যে ধর্মীয় চর্চার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে, বিশেষ করে প্রার্থনা সভায় উপস্থিতির ক্ষেত্রে। তার ভাষায়, “আমরা কানাডাজুড়ে একটি আন্দোলন দেখতে পাচ্ছি তরুণরা আবার প্রার্থনার দিকে ফিরছে।”

ডাউনটাউন টরন্টোর ঐতিহ্যবাহী অ্যাঙ্গলিকান চার্চ সেন্ট পল’স ব্লুর স্ট্রিট মহামারির পর এই পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি উপলব্ধি করছে। চার্চটির রেক্টর বিশপ জেনি অ্যান্ডিসন জানান, কোভিড-১৯-পরবর্তী প্রথম কয়েকটি রবিবার চার্চের দরজা খুলতেই দেখা যায় তরুণদের অস্বাভাবিক ভিড়। যে বয়সশ্রেণি সবচেয়ে বেশি উপস্থিত ছিল তা হলো জেনারেশন জি।

মহামারির আগে যেখানে সেন্ট পল’স চার্চে কেবল ৪৫ জন তরুণ নিয়মিত আসতেন, বর্তমানে সেই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৫০০-তে পৌঁছেছে। বিশপ অ্যান্ডিসনের মতে, কোভিড-১৯ মানুষের মনে এক ধরনের গভীর প্রশ্ন ও শূন্যতার জন্ম দিয়েছিল। অনেকেই নিজেদের ভবিষ্যৎ, মানসিক স্বাস্থ্য, একাকিত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা নিয়ে ভাবতে শুরু করেন।

তার মন্তব্য, “জেন জিরা চারদিকে তাকিয়ে দেখছে ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় ভরা, ভয়ের এবং একাকিত্বের। ধর্মনিরপেক্ষতা এসবের সমাধান দিতে পারছে না। যদিও ধর্মনিরপেক্ষতার মূল ধারণা হলো স্বাধীনতা ও প্রগতিশীলতা।”

স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার ২০২২ সালের জেনারেল সোশ্যাল সার্ভেও চার্চ নেতাদের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে মিল রেখেছে। ১৫–২৪ বছর বয়সী তরুণদের ২২% মাসে অন্তত একবার প্রার্থনা সভায় যোগ দেয়। তুলনায় ২৫–৬৪ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে এই হার যথাক্রমে ১৫% ও ১৭%। এতে বোঝা যাচ্ছে, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ধর্মীয় অংশগ্রহণ বরং বেশি, যা বহু বছর ধরে প্রচলিত ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক।

বিশেষজ্ঞদের মতে এর কয়েকটি কারণ

১. মানসিক স্বাস্থ্য সংকট : কোভিড-১৯ মহামারির সময় তরুণদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। অনেকেই শান্তি ও মানসিক স্থিরতার খোঁজে ধর্মীয় স্থানে যেতে শুরু করেন।

২. অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ : অর্থনীতি, জলবায়ু সংকট, বৈশ্বিক রাজনীতি এসবের কারণে তরুণরা ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। তাই তারা আত্মিক আশ্রয় খুঁজছে।

৩. সম্প্রদায়ের প্রয়োজন : ধর্মীয় কেন্দ্রগুলোতে সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংযোগের অনুভূতি পাওয়া যায়, যা একাকিত্ব কমাতে ভূমিকা রাখে।

৪. পরিচয়ের খোঁজ : তরুণরা জীবনের উদ্দেশ্য ও পরিচয় নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে। প্রার্থনা বা ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ তাদের সেই অনুসন্ধানে দিশা দেয়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পশ্চিমা সমাজে ধর্মীয় অনাগ্রহ বেড়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এলেও কানাডায় তরুণদের এই নতুন আগ্রহ একটি ভিন্নধর্মী সামাজিক পরিবর্তনের সংকেত দিচ্ছে। বিশেষ করে জেনারেশন জির মতো প্রযুক্তিনির্ভর, উদার ও বৈচিত্র্যমুখী প্রজন্মের মধ্যে প্রার্থনার প্রতি ঝোঁক বাড়া সমাজবিজ্ঞানীদের কাছে একটি গবেষণাযোগ্য বিষয়।

এ পরিবর্তন কি দীর্ঘমেয়াদি হবে, নাকি মহামারির অভিজ্ঞতার কারণে সাময়িক প্রতিক্রিয়া তা সময়ই বলে দেবে। তবে আপাতত এটি সত্য যে, কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো কানাডার চার্চগুলোতে তরুণদের পদচারণা আবার জোরালোভাবে শোনা যাচ্ছে।

Related Articles

Back to top button