কাজ খুজে পেতে হিমশিম খাচ্ছে তরুণরা

জামির হোসেন

কানাডায় সদ্য গ্রাজুয়েশন করা তরুণদের জন্য চাকরির বাজার দিন দিন কঠিনতর হয়ে উঠছে।

কানাডায় সদ্য গ্রাজুয়েশন করা তরুণদের জন্য চাকরির বাজার দিন দিন কঠিনতর হয়ে উঠছে। যোগ্যতা, দক্ষতা ও উচ্চতর ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও অনেকেই চাকরি পেতে সংগ্রাম করছেন। বয়স্ক প্রজন্মের সন্দেহ ও সমালোচনা এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে বলে মনে করছেন নতুন গ্রাজুয়েটরা।

টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস প্রোগ্রাম থেকে গত বছর গ্রাজুয়েশন শেষ করা সামি রশীদ তারই একটি উদাহরণ। বিশ্ববিদ্যালয়ে চমৎকার ফলাফল এবং ইন্টার্নশিপ অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও গত এক বছরে চাকরি পেতে তাকে লড়াই করতে হয়েছে।

দি কারেন্টের ম্যাট গ্যালোওয়েকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রশীদ বলেন, “অনেক সময় বয়স্ক প্রজন্ম বলে আমরা কিছু ভুল করছি, কিন্তু তারা বুঝতে চায় না যে যে কাজ করতে তারা বলেন, তার বেশিরভাগই আমি আগেই করছি। এটা খুব হতাশাজনক।” গ্রাজুয়েশনের সময় তাকে বিশ্বাস করানো হয়েছিল যে চাকরি পাওয়া তার জন্য সহজ হবে। কিন্তু বাস্তবতা হয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

রশীদ জানান, গত এক বছরে তিনি ১,১০০টিরও বেশি আবেদন পাঠিয়েছেন। কিন্তু উত্তর এসেছে মাত্র কয়েকটি। “প্রতিদিন সকালে আমি ভয় নিয়ে ঘুম থেকে উঠি। তারপর চাকরি খোঁজার পেছনে আরও আট ঘণ্টা ব্যয় করি। যখন হাতে টাকা থাকে না, তখন মনে হয় সব দরজাই আমার জন্য বন্ধ,” বলেন তিনি। অনিশ্চয়তা ও আর্থিক চাপে ভেঙে পড়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে অনেক তরুণের জন্যই।

দীর্ঘ এক বছরের লড়াইয়ের পর রশীদ সম্প্রতি একটি ব্যাংকে ছয় মাসের চুক্তিভিত্তিক চাকরি পেয়েছেন। তিনি আশা করছেন এটি স্থায়ী হবে। “যেখানে ছিলাম সেখান থেকে এটা অবশ্যই অগ্রগতি। তবে এটা আমার প্রত্যাশামতো নয়,”বলেছেন তিনি।

স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার সর্বশেষ উপাত্ত বলছে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের বেকারত্বের হার আগস্টে দাঁড়িয়েছে ১৪.৫%। জুলাইয়ে দেখা গেছে, কানাডার মাত্র ৫৪% তরুণ চাকরিতে নিয়োজিত ছিলেন যা ১৯৯৮ সালের পর সর্বনিম্ন হার (মহামারিকাল বাদে)। সিবিসির অর্থনৈতিক বিশ্লেষক পাওলা ডুহাটসচেক জানান, এ পরিস্থিতি শুধু সাময়িক চ্যালেঞ্জ নয়; বরং পুরো প্রজন্মের জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জেন জি শ্রেণির তরুণদের বেকারত্ব বাড়ার পেছনে কয়েকটি কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। যেমন –

১. পোস্ট-প্যান্ডেমিক অর্থনৈতিক ধাক্কা

মহামারির পর কানাডায় বিনিয়োগ, নিয়োগ ও ব্যবসায়িক খরচ কমে গেছে। কোম্পানিগুলো কর্মী কমিয়েও ব্যয় সাশ্রয় করছে।

২. অভিজ্ঞতার চাহিদা বেড়েছে

এন্ট্রি-লেভেল চাকরির ক্ষেত্রেও এখন কোম্পানিগুলো ২–৩ বছরের অভিজ্ঞতা চাইছে, যা সদ্য গ্রাজুয়েটদের জন্য অযৌক্তিক চাপ তৈরি করছে।

৩. ইমিগ্রেশন ও শ্রমবাজারের প্রতিযোগিতা

বাংলাদেশ, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে দক্ষ প্রার্থীর আগমন বাড়ছে। ফলে একেকটি চাকরির জন্য আবেদন সংখ্যা বেড়ে হাজার ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

৪. বয়স্ক প্রজন্মের ভিন্ন প্রত্যাশা

অনেক সিনিয়র কর্মী জেন জি প্রজন্মকে ‘অধিক ছুটি চাওয়া’, ‘কম পরিশ্রমী’ বা ‘অতিরিক্ত সুবিধাপ্রত্যাশী’ এমন ধারণায় দেখেন। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ তরুণই লম্বা সময় কাজ করছেন এবং দক্ষতা বাড়ানোর জন্য কোর্স করছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে তরুণদের ক্যারিয়ার শুরু করতে বেশি সময় লাগবে, আয়ের স্থিতিশীলতায় দেরি হবে, বাড়ি কেনা বা পরিবার গড়ার মতো সিদ্ধান্ত পিছিয়ে যাবে এবং আর্থিক বৈষম্য বাড়বে। তবে ইতিবাচক দিক হলো, ব্যাংকিং, ফাইন্যান্স, টেক সাপোর্ট ও ডিজিটাল মার্কেটিং এ ধরনের খাতে আবার নিয়োগ বাড়ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন দক্ষতার তরুণ নিয়োগে আগ্রহী।

কানাডার তরুণদের জন্য চাকরির বাজার কঠিন হয়ে উঠলেও তারা হাল ছাড়ছেন না। রশীদের মতো অনেকেই দিন-রাত পরিশ্রম করে নিজেদের জায়গা করে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু অর্থনীতি ও শ্রমবাজারের কাঠামোগত পরিবর্তন না হলে চাকরি খোঁজার এই সংগ্রাম আরও দীর্ঘ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

Related Articles

Back to top button