মাঝারি শক্তির দেশগুলোকে নতুন পথে হাঁটার বার্তা মার্ক কার্নির

মাহবুবুল আলম

কার্নি জোর দিয়ে বলেন, কানাডাকে নিজেদের ভিত মজবুত করতে হবে।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনে দাভোসে এক গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতায় কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি স্পষ্ট ভাষায় জানালেন বর্তমান বৈশ্বিক ব্যবস্থা আর আগের মতো কাজ করছে না। মার্কিন নেতৃত্বাধীন যে নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও বাণিজ্যকে নিয়ন্ত্রণ করেছে, সেটি কার্যত শেষ হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

কার্নি সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম না নিলেও, তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল বর্তমান বড় শক্তিগুলোর নীতির দিকে। তিনি বলেন, আজকের বিশ্বে বড় দেশগুলো অর্থনীতি ও বাণিজ্যকে কূটনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। শুল্ক, নিষেধাজ্ঞা এবং বাণিজ্যিক চাপ এখন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কানাডার পূর্ববর্তী ধারণার কথাও তুলে ধরেন কার্নি। তাঁর মতে, একসময় কানাডা মনে করত মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটে থাকা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভৌগোলিক প্রতিবেশী হওয়াই দেশটির নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করবে। কিন্তু বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই ধারণা আর পুরোপুরি সত্য নয়।

এই প্রেক্ষাপটে কার্নি জোর দিয়ে বলেন, কানাডাকে নিজেদের ভিত মজবুত করতে হবে। নতুন বাজার খুঁজে বের করা, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বৈচিত্র্য আনা এখন সময়ের দাবি। তিনি জানান, শুধু একটি শক্তিশালী দেশের ওপর ভর করে ভবিষ্যৎ নিরাপদ রাখা আর সম্ভব নয়।

আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO) কিংবা জাতিসংঘের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো আগের মতো কার্যকরভাবে কাজ করতে পারছে না। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই দেশগুলোকে নিজেদের মতো করে পথ খুঁজে নিতে হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “যে দেশ নিজেকে রক্ষা করতে পারে না, নিজের জনগণকে খাওয়াতে পারে না কিংবা জ্বালানি জোগাতে পারে না সেই দেশের সামনে বিকল্প খুবই সীমিত।”

কার্নির বক্তব্যে উঠে আসে বৈশ্বিক আত্মনির্ভরতার প্রবণতাও। তিনি বলেন, বর্তমানে অনেক দেশই নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে জোর দিচ্ছে খাদ্য নিরাপত্তা, জ্বালানি, খনিজ সম্পদ, আর্থিক ব্যবস্থা এবং সরবরাহ শৃঙ্খল সব ক্ষেত্রেই। এই প্রবণতা ভবিষ্যতের বিশ্ব রাজনীতিকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করবে বলে মনে করেন তিনি।

মাঝারি শক্তির দেশগুলোর ভূমিকা নিয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেন কার্নি। তাঁর মতে, এসব দেশকে একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে হবে। আলোচনার টেবিলে জায়গা না পেলে সিদ্ধান্ত অন্যরা নেবে এমন সতর্কবার্তা দিয়ে তিনি রসিকতার সুরে বলেন, “আপনি যদি আলোচনার টেবিলে না থাকেন, তাহলে আপনি খাবারের তালিকায় থাকবেন।”

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর কানাডার নেওয়া নীতিগত পদক্ষেপগুলোর কথাও তুলে ধরেন কার্নি। তিনি জানান, তাঁর সরকার প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়িয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করেছে, চীনের সঙ্গে বাণিজ্য অব্যাহত রেখেছে এবং এশিয়ার একাধিক দেশের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য চুক্তির চেষ্টা চালাচ্ছে।

তবে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মাঝেও কানাডার ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী কার্নি। তাঁর মতে, কানাডার হাতে রয়েছে বিপুল জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ, একটি শিক্ষিত ও দক্ষ জনগোষ্ঠী, বিনিয়োগ টানার ক্ষমতা এবং এমন মূল্যবোধ যা অনেক দেশই তাদের অংশীদার হিসেবে চায়।

আর্কটিক অঞ্চল ও গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতেও স্পষ্ট অবস্থান নেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, এই বিষয়ে কানাডা ডেনমার্কের পাশে রয়েছে এবং গ্রিনল্যান্ড দখলের কোনো ধারণা বা শুল্ক আরোপের হুমকির বিরোধিতা করে। পরোক্ষভাবে তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের এমন মনোভাবের বিরুদ্ধেই বার্তা দেন।

সব মিলিয়ে দাভোসে মার্ক কার্নির বক্তৃতা ছিল বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার এক কঠোর বাস্তব বিশ্লেষণ যেখানে কানাডা ও অন্যান্য মাঝারি শক্তির দেশগুলোর জন্য নতুন কৌশল, নতুন জোট এবং নতুন চিন্তাধারার প্রয়োজনীয়তার কথা স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।

Related Articles

Back to top button