লাইট থেরাপি ডিভাইস কিনতে শিক্ষার্থীর ১৪ হাজার ডলার ঋণ

জামির হোসেন

একটি রেড-লাইট থেরাপি ডিভাইস কেনার প্রলোভনে পড়ে তিনি এমন একটি ঋণচুক্তিতে স্বাক্ষর করেন, যার মোট দায় গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৪ হাজার মার্কিন ডলার

কানাডার অন্টারিও প্রদেশের মিসিসোগার এক কলেজ শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতা এখন ভোক্তা-সচেতনতার আলোচনায় নতুন করে প্রশ্ন তুলছে। একটি রেড-লাইট থেরাপি ডিভাইস কেনার প্রলোভনে পড়ে তিনি এমন একটি ঋণচুক্তিতে স্বাক্ষর করেন, যার মোট দায় গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৪ হাজার মার্কিন ডলার। পরে বিষয়টি বুঝতে পেরে তিনি অনুতাপ প্রকাশ করেছেন এবং পুরো ঘটনাকে “চাপ সৃষ্টি করে বিক্রি” কৌশলের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

মেরেডিথ (ছদ্মনাম), যিনি মিসিসোগায় একটি কলেজে পড়াশোনা করছেন, জানান গত বছরের নভেম্বরে একটি শপিং মলে হাঁটার সময় তাকে বিনামূল্যে স্কিনকেয়ার নমুনা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। নমুনার মধ্যে একটি ছিল স্কিন রিল্যাক্সার ক্রিম। বিক্রয়কর্মীরা তাকে জানান, তিনি একটি “ফ্রি স্কিন অ্যানালাইসিস”-এর জন্য নির্বাচিত হয়েছেন।

প্রথমে বিষয়টি সাধারণ প্রচারণা বলেই মনে হয়েছিল তার। কিন্তু বিশ্লেষণের নামে একটি সেশনে তাকে একটি রেড-লাইট থেরাপি ডিভাইস ব্যবহার করে দেখানো হয়। মেরেডিথের ভাষ্য, “তারা মেশিনটি বের করে আমার মুখে কিছু না বলেই ব্যবহার করতে শুরু করে। আমি পুরো বিষয়টা বুঝে ওঠার আগেই পরিস্থিতি এগিয়ে যায়।”

সেশনের শেষে তাকে ডিভাইসটি কেনার প্রস্তাব দেওয়া হয়। বিক্রয়কর্মীরা দাবি করেন, এটি নিয়মিত ব্যবহারে ত্বকের দৃশ্যমান উন্নতি হবে। শুরুতে তিনি ১,৪০০ ডলার পরিশোধে রাজি হন, যা তাকে ‘ডাউনপেমেন্ট’ হিসেবে জানানো হয়। কিন্তু পরে বাড়িতে গিয়ে কাগজপত্র খতিয়ে দেখে তিনি বুঝতে পারেন, আসলে তিনি ২৫ শতাংশ সুদে ১০ হাজার ডলারের একটি ঋণচুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। সুদ ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে মোট দায় দাঁড়ায় প্রায় ১৪ হাজার ডলার।

মেরেডিথ বলেন, “আমি তাদের স্পষ্ট বলেছিলাম, ১৪ হাজার ডলার পরিশোধ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। আমি তো শুধু একজন শিক্ষার্থী এত বড় অঙ্কের অর্থ কোথা থেকে আসবে?”

তিনি যে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিতে সই করেছিলেন, সেটির নাম দি সোপ ট্রি। মেরেডিথের ধারণা ছিল, সিদ্ধান্ত বদলালে তিনি পণ্যটি ফেরত দিতে পারবেন। কিন্তু মলে ফিরে গিয়ে তিনি দেখেন, যে স্টোর থেকে ডিভাইসটি কিনেছিলেন সেটি পুরোপুরি বন্ধ। দোকানের ভেতরে কোনো আসবাব বা পণ্য নেই, দরজা তালাবদ্ধ। “স্টোরটি আর সেখানে নেই। পুরো জায়গাটা খালি। কোনো কর্মী নেই, কোনো সাইন নেই কিছুই না,” বলেন তিনি। এই বিষয় নিয়ে গণমাধ্যমটি দি সোপ ট্রির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

এদিকে ঋণটি নেওয়া হয়েছিল লেন্ডকেয়ারের মাধ্যমে। প্রতিষ্ঠানটির মূল কোম্পানি গোইজির একজন মুখপাত্র জানান, লেন্ডকেয়ারের অর্থায়নে কেনা কোনো পণ্য ফেরত দিতে হলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট মার্চেন্টকে (বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান) রিফান্ড প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। মার্চেন্ট অনুমোদন না দিলে ঋণ বাতিল করা সম্ভব নয়।

এই বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে, কারণ স্টোরটি আর কার্যকর নেই বলে দাবি করেছেন মেরেডিথ। ফলে ঋণচুক্তি বাতিলের পথ কার্যত অনিশ্চিত।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শপিং মলে ‘ফ্রি অ্যানালাইসিস’ বা ‘বিনামূল্যের নমুনা’ দিয়ে শুরু হওয়া প্রচারণা অনেক সময় উচ্চমূল্যের পণ্য বিক্রির কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। গ্রাহককে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে চাপ দেওয়া, পণ্যের কার্যকারিতা বাড়িয়ে উপস্থাপন করা এবং সঙ্গে সঙ্গে অর্থায়নের ব্যবস্থা করে দেওয়া এসব কৌশল মিলিয়ে ভোক্তাকে এমন আর্থিক দায়ে ফেলে দেওয়া হয়, যা তিনি সম্পূর্ণভাবে বুঝে ওঠার আগেই চুক্তিবদ্ধ হয়ে যান।

বিশেষ করে শিক্ষার্থী বা তরুণ গ্রাহকদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল। সীমিত আয়, আর্থিক অনভিজ্ঞতা এবং তাৎক্ষণিক প্রভাবিত হওয়ার ঝুঁকি সব মিলিয়ে তারা সহজেই বড় অঙ্কের ঋণে জড়িয়ে পড়তে পারেন।

মেরেডিথের ঘটনা ভোক্তাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা কোনো পণ্যের ডেমো বা প্রস্তাবে রাজি হওয়ার আগে চুক্তির প্রতিটি শর্ত মনোযোগ দিয়ে পড়া, সুদের হার ও মোট পরিশোধযোগ্য অর্থ স্পষ্টভাবে বোঝা এবং প্রয়োজনে সিদ্ধান্ত নিতে সময় চাওয়া জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, “তাৎক্ষণিক অফার” বা “এখনই সিদ্ধান্ত” ধরনের চাপ এলে সেটিই সতর্ক সংকেত হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

এই ঘটনায় মেরেডিথ এখন আইনি ও ভোক্তা-অধিকার সংস্থার সহায়তা খুঁজছেন। তার অভিজ্ঞতা শুধু ব্যক্তিগত অনুতাপের গল্প নয় বরং আর্থিক সচেতনতার গুরুত্বের এক বাস্তব উদাহরণ।

Related Articles

Back to top button