অফিসে ফেরার আদেশে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত নারী কর্মীরা

মাসুদ করিম

বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্মস্থলে উপস্থিতির বাধ্যবাধকতা বাড়ার ফলে কর্মজীবী নারীদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের ভারসাম্য রক্ষা করা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে

কোভিড-১৯ মহামারির সময় বিশ্বজুড়ে কর্মপদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন আসে। বহু প্রতিষ্ঠান কর্মীদের বাড়ি থেকে কাজ করার সুযোগ দেয়, যা অনেকের কাছে নতুন বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়। কয়েক বছর ধরে এই দূরবর্তী বা হাইব্রিড কর্মব্যবস্থা চালু থাকলেও এখন অনেক সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আবার কর্মীদের নিয়মিত অফিসে ফিরিয়ে আনতে শুরু করেছে। তবে এই সিদ্ধান্ত কর্মক্ষেত্রে নারীদের ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্মস্থলে উপস্থিতির বাধ্যবাধকতা বাড়ার ফলে কর্মজীবী নারীদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের ভারসাম্য রক্ষা করা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে। কারণ সামাজিক বাস্তবতায় এখনও পরিবারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বিশেষ করে শিশু ও বয়স্ক সদস্যদের দেখভাল নারীদের ওপরই বেশি পড়ে।

একটি অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠানের প্রধান মেরি জ্যামন এ প্রসঙ্গে বলেন, মহামারির সময় চালু হওয়া নমনীয় কর্মব্যবস্থা অনেক নারীর জন্য বড় সহায়ক ছিল। বাড়ি থেকে কাজ করার সুযোগ থাকায় তারা একদিকে অফিসের দায়িত্ব পালন করতে পারতেন, অন্যদিকে পরিবারের প্রয়োজনীয় কাজও সামলাতে পারতেন। কিন্তু এখন যখন সেই নমনীয়তা কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে বা প্রত্যাহার করা হচ্ছে, তখন ব্যবস্থাপনাগত চাপের বড় অংশ নারীদের ওপর এসে পড়ছে।

তার মতে, এই পরিস্থিতিতে অনেক নারী বাধ্য হয়ে কর্মঘণ্টা কমিয়ে দিতে পারেন, যা তাদের ক্যারিয়ার অগ্রগতিতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে নেতৃত্বের সুযোগ হারানো কিংবা চাকরি ছেড়ে দেওয়ার মতো কঠিন সিদ্ধান্তও নিতে হতে পারে। তিনি বলেন, “কর্মজীবন ও পারিবারিক দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য আনা অনেক সময় সত্যিই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।”

বিশ্লেষকরা আরও বলেন, পরিবারের দায়িত্ব ভাগাভাগির ক্ষেত্রে পুরুষদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এখনও অনেক সমাজেই সীমিত। ফলে যখন কর্মক্ষেত্রে নমনীয়তা কমে যায়, তখন সেই ঘাটতি পূরণ করার দায়িত্বও নারীদের ওপরই বেশি পড়ে।

কানাডার বেশ কয়েকটি বড় ব্যাংক এবং বৃহৎ করপোরেট প্রতিষ্ঠান গত গ্রীষ্মে কর্মীদের সপ্তাহে অন্তত চার দিন অফিসে উপস্থিত থেকে কাজ করার পরিকল্পনা ঘোষণা করে। শুধু বেসরকারি খাত নয়, মিউনিসিপাল প্রশাসন থেকে শুরু করে ফেডারেল সরকারও ধীরে ধীরে কর্মীদের অফিসে কাজের সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এই নীতির ফলে কর্মক্ষেত্রে একটি স্পষ্ট লিঙ্গভিত্তিক প্রভাব দেখা যাচ্ছে বলে মনে করছেন গবেষকরা। তাদের মতে, যদি বাড়ি থেকে কাজ করার সুযোগ কিছুটা হলেও বজায় রাখা যায়, তাহলে তা শুধু সন্তান আছে এমন কর্মীদের জন্য নয়, বরং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার জীবন ব্যবস্থাপনাকে সহজ করতে পারে।

২০২৪ সালে স্ট্যাটিস্টিকস কানাডা পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, ২০২২ সালে যারা বাড়ি থেকে কাজ করেছেন তারা প্রতিদিন গড়ে এক ঘণ্টারও বেশি অতিরিক্ত সময় অন্যান্য কাজে ব্যয় করতে পেরেছেন। মূলত অফিসে যাতায়াতের সময় বাঁচার কারণেই এই অতিরিক্ত সময় পাওয়া সম্ভব হয়েছে।

গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়, এই সময়টুকু নারী ও পুরুষ উভয়েই গৃহস্থালির কাজে ব্যবহার করতে পেরেছেন। এর মধ্যে ছিল রান্না করা, কাপড় ধোয়া, ঘর পরিষ্কার করা কিংবা পরিবারের অন্য সদস্যদের দেখভাল করা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্মক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণে এই বাস্তবতাগুলো বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। কারণ নমনীয় কর্মব্যবস্থা শুধু কর্মীদের উৎপাদনশীলতাই বাড়ায় না, বরং তাদের মানসিক চাপ কমিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনধারা গড়ে তুলতেও সহায়তা করে। আর সেই ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন কর্মজীবী নারীরাই।

Masud Karim : Local Journalism Initiative Reporter

Related Articles

Back to top button