কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষক সংকট কাটাতে দক্ষ কর্মীদের শিক্ষকতায় আনার আহ্বান

মাসুদ করিম

অন্টারিও শিক্ষক ফেডারেশন যা সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষকের প্রতিনিধিত্ব করে ইতোমধ্যেই প্রাদেশিক সরকারের কাছে বেশ কিছু সুপারিশ জমা দিয়েছে

অন্টারিও প্রদেশে প্রযুক্তি ও কারিগরি বিষয় পড়ানোর জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক শিক্ষক না থাকায় শিক্ষা ব্যবস্থায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই সংকট দ্রুত সমাধান না করা গেলে ভবিষ্যতে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে এবং শিক্ষার্থীদের কারিগরি পেশায় যুক্ত হওয়ার সুযোগও সীমিত হয়ে পড়বে।

অন্টারিও শিক্ষক ফেডারেশন যা সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষকের প্রতিনিধিত্ব করে ইতোমধ্যেই প্রাদেশিক সরকারের কাছে বেশ কিছু সুপারিশ জমা দিয়েছে। তাদের মূল লক্ষ্য হলো দক্ষ পেশাজীবীদের জন্য শিক্ষকতায় যোগদানের পথকে আরও সহজ এবং আর্থিকভাবে বাস্তবসম্মত করে তোলা।

অন্টারিও শিক্ষক ফেডারেশনের একজন প্রতিনিধি এই প্রতিবেদককে বলেন, কারিগরি খাতে কর্মরত অনেক দক্ষ পেশাজীবী শিক্ষকতায় আগ্রহ দেখালেও আয় কমে যাওয়ার সম্ভাবনা তাদের নিরুৎসাহিত করে। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষকতার প্রারম্ভিক বেতন সংশ্লিষ্ট শিল্পখাতের আয়ের তুলনায় কম হওয়ায় তারা পেশা পরিবর্তনে দ্বিধায় পড়েন। ফলে এই পেশাকে আকর্ষণীয় করে তোলা এখন সময়ের দাবি।

অন্টারিওতে শিক্ষক সংকট নতুন নয়। কয়েক বছর আগে শিক্ষক প্রশিক্ষণের সময়সীমা এক বছর থেকে বাড়িয়ে দুই বছর করা হলে নতুন শিক্ষক তৈরির গতি কমে যায়, যা সংকটকে আরও তীব্র করে তোলে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক নথিপত্রেও বিশেষ করে ফরাসি ভাষা ও কারিগরি শিক্ষকের ঘাটতির বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩–২০২৪ শিক্ষাবর্ষে ইংরেজি ভাষার শিক্ষা অনুষদগুলোতে কারিগরি শিক্ষা বিষয়ে শিক্ষক হওয়ার প্রশিক্ষণে ভর্তি হয়েছেন মাত্র ৩৬৫ জন। অন্যদিকে, ফরাসি ভাষার একমাত্র প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল মাত্র ২৫ যা চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত কম।

এই সংকট মোকাবিলায় অন্টারিও সরকার ইতোমধ্যে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। ২০২৪ সালে একটি বিধিমালা পরিবর্তনের মাধ্যমে সাধারণ যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকদেরও প্রযুক্তি ও দক্ষ পেশা বিষয়ক বাধ্যতামূলক কোর্স পড়ানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রীর কার্যালয়ের এক মুখপাত্র এই প্রতিবেদককে বলেন, এই উদ্যোগ বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষাদানে নমনীয়তা বাড়িয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শেখার সুযোগ বৃদ্ধি করেছে। এছাড়া, ২০২৭ সালের মধ্যে প্রায় ২,৬০০ নতুন শিক্ষক তৈরি করতে সরকার ৫৮ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কারিগরি শিক্ষা কর্মসূচিতে আসনসংখ্যা বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।

তবে শিক্ষক সংকট সমাধানে যোগ্যতার মান কমানোর প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে শিক্ষক সংগঠন। তাদের মতে, কারিগরি বিষয় পড়ানোর জন্য বিশেষজ্ঞ জ্ঞান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অনেক ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকিও থাকে। তাই মান বজায় রেখে সমাধান খোঁজাই সবচেয়ে জরুরি। বর্তমানে কারিগরি শিক্ষা বিষয়ের শিক্ষক হতে হলে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে অন্তত পাঁচ বছরের কর্মঅভিজ্ঞতা বা সমমানের শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার সমন্বয় থাকা বাধ্যতামূলক। এই শর্ত শিথিল করার পরিবর্তে বিকল্প পথ খোঁজার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা উচিত যেখানে আগ্রহীরা শিক্ষক হওয়ার প্রস্তুতির পাশাপাশি তাদের বর্তমান পেশায় কাজ চালিয়ে যেতে পারবেন। এতে আয় বন্ধ না করেই শিক্ষকতায় প্রবেশের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে দক্ষ পেশাজীবীদের পূর্ব অভিজ্ঞতাকে বেতন কাঠামো নির্ধারণে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করলে শিক্ষকতা পেশা তাদের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশি কানাডিয়ান শিক্ষক জোহরা আলীম বলেন, সংকট কেবল শিক্ষক সংকট নয় এটি ভবিষ্যৎ কর্মবাজারের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। বিদ্যালয় পর্যায়ে কারিগরি শিক্ষার মান উন্নত না হলে শিক্ষার্থীরা বাস্তবমুখী দক্ষতা অর্জনে পিছিয়ে পড়বে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। সর্বোপরি, অন্টারিওতে কারিগরি শিক্ষকের সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা যেখানে শিক্ষকতার পেশাকে আরও আকর্ষণীয় করা, প্রশিক্ষণের সুযোগ বৃদ্ধি এবং দক্ষ পেশাজীবীদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা হবে। তবেই শিক্ষার্থীদের জন্য দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার পথ আরও উন্মুক্ত হবে।

মাসুদ করিম : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার

Related Articles

Back to top button