বিতর্কিত বই ঘিরে চাপ, নাইয়াগ্রা আঞ্চলিক পরিষদের প্রধানের পদত্যাগ

জামির হোসেন

নায়াগ্রা অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিষদের প্রধান বব গেইল শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করেছেন

অন্টারিওর নায়াগ্রা অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিষদের প্রধান বব গেইল শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করেছেন। তার ব্যক্তিগত সংগ্রহে নাৎসি নেতা অ্যাডলফ হিটলারের স্বাক্ষরযুক্ত একটি বই থাকার অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পরই এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। বিষয়টি শুধু রাজনৈতিক পরিসরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং সামাজিক ও নৈতিক প্রশ্নও সামনে এনে দিয়েছে।

নায়াগ্রা অঞ্চল বর্ণবাদবিরোধী সমিতি প্রথম এই অভিযোগ তোলে। তাদের দাবি, ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একটি নিলাম থেকে হিটলারের স্বাক্ষরযুক্ত একটি বই কেনা হয়েছিল, এবং সংশ্লিষ্ট নথি তাদের হাতে রয়েছে। শুধু তাই নয়, বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে সেই স্বাক্ষরের সত্যতাও যাচাই করা হয়েছে বলে তারা জানায়। উপস্থিত নথিতে বইটির ক্রয়-বিক্রয়ের তথ্য ছাড়াও একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদন রয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, বইটিতে শুধু হিটলারের স্বাক্ষরই নয়, একটি লিখিত বার্তাও রয়েছে, যা থেকে ধারণা করা হয় এটি নাৎসি দলের এক প্রভাবশালী সদস্য ম্যাক্স সাউয়ারটাইগকে উপহার দেওয়া হয়েছিল।

এছাড়া আরও একটি চিঠির উল্লেখ পাওয়া যায়, যেখানে গেইল বিদেশ থেকে কেনা এই বই কানাডায় আনা আইনত সম্ভব কি না তা জানতে সীমান্ত কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। পরে তাকে জানানো হয়, আইনি দিক থেকে এটি দেশে আনা যেতে পারে।

বুধবার এক যৌথ বিবৃতিতে নায়াগ্রা অঞ্চল বর্ণবাদবিরোধী সমিতি এবং স্থানীয় কৃষ্ণাঙ্গ অধিকার সংগঠন গেইলের কাছে প্রকাশ্যে ব্যাখ্যা ও ক্ষমা প্রার্থনার দাবি জানায়। সংগঠনের প্রতিনিধি সালেহ ওয়াজিরউদ্দিন বলেন, “এটি শুধুমাত্র একটি পুরোনো বই নয়; এটি এমন একটি মতাদর্শের প্রতীক, যা ইতিহাসে অসংখ্য মানুষের ওপর নির্যাতন ও সহিংসতার স্মৃতি বহন করে।” তার মতে, একজন উচ্চপদস্থ জনপ্রতিনিধির ব্যক্তিগত সংগ্রহে এমন বস্তু থাকা সমাজের জন্য উদ্বেগজনক।

সমালোচনার মুখে গেইল নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে ইতিহাসসংক্রান্ত বিভিন্ন নিদর্শন সংগ্রহ করে আসছেন। তার সংগ্রহে দাসপ্রথা বিরোধী আন্দোলনের নেতা জন ব্রাউনের চিঠি, যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটনের লেখা দলিল, ব্রিটিশ নেতা উইনস্টন চার্চিলের চিঠি এবং ভ্যাটিকানের কিছু নথিও রয়েছে। তার যুক্তি ছিল, ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল সংগ্রহ করা তার ব্যক্তিগত আগ্রহের অংশ। তবে সমালোচকদের মতে, অন্যান্য ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের দলিলের সঙ্গে নাৎসি নেতার স্মারককে একইভাবে দেখা যায় না।

নায়াগ্রা ফলস শহরের মেয়র জিম ডিওদাতি মন্তব্য করেন, অনেক মানুষ ব্যক্তিগত আগ্রহ থেকে বিভিন্ন ধরনের ঐতিহাসিক স্মারক সংগ্রহ করেন, যার মধ্যে কিছু বিতর্কিত বিষয়ও থাকতে পারে। তবে প্রাদেশিক পর্যায়ে প্রতিক্রিয়া ছিল আরও কঠোর। অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড বলেন, ঘটনাটি হতাশাজনক হলেও গেইলের পদত্যাগই ছিল সঠিক সিদ্ধান্ত। তিনি জানান, এখন অঞ্চলের জন্য নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের দিকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।

উল্লেখযোগ্যভাবে, গেইল সম্প্রতি নায়াগ্রা অঞ্চলের প্রশাসনিক কাঠামো পরিবর্তনের একটি প্রস্তাব নিয়েও সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। কয়েকজন মেয়র ও স্থানীয় বাসিন্দা সেই পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছিলেন। ফলে এই নতুন বিতর্ক তার নেতৃত্বকে আরও দুর্বল করে তোলে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রাদেশিক পৌরবিষয়ক ও আবাসন মন্ত্রী রব ফ্ল্যাক তাকে এই পদে নিয়োগ দেন। এর আগে দীর্ঘদিন দায়িত্বে থাকা জিম ব্র্যাডলির মৃত্যুর পর পদটি শূন্য হয়েছিল।

এই ঘটনাটি শুধু একজন নেতার পদত্যাগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি ইতিহাস, নৈতিকতা এবং জননেতার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের প্রভাব নিয়ে একটি বৃহত্তর বিতর্ক উত্থাপন করেছে। প্রশ্ন উঠেছে ইতিহাস সংরক্ষণ আর বিতর্কিত মতাদর্শের প্রতীককে ব্যক্তিগতভাবে ধারণ করার মধ্যে সীমারেখা কোথায়? গেইলের পদত্যাগের মাধ্যমে আপাতত এই অধ্যায়ের সমাপ্তি হলেও, সমাজে এর প্রভাব এবং আলোচনার ধারা আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

Related Articles

Back to top button