টরন্টো আইল্যান্ডের বাসিন্দাদের সঙ্গে ফোর্ডের দ্বন্ধ চরমে

মাসুদ করিম

ফোর্ডের এই মন্তব্যে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন আইল্যান্ডের বাসিন্দারা। তারা বলছেন, এটি শুধু তথ্যগতভাবে ভুল নয়, বরং অপমানজনকও

কানাডার অন্টারিও প্রদেশের রাজধানী টরন্টোতে বিলি বিশপ টরন্টো সিটি এয়ারপোর্ট সম্প্রসারণ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক আবারও নতুন করে তীব্র আকার ধারণ করেছে। প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ডের সাম্প্রতিক মন্তব্য এই বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে, বিশেষ করে টরন্টো আইল্যান্ডের বাসিন্দাদের নিয়ে তার বক্তব্য ঘিরে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

গত সপ্তাহে প্রিমিয়ার ফোর্ড প্রকাশ্যে জানান, তিনি বিলি বিশপ এয়ারপোর্টের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের বিষয়ে অত্যন্ত আগ্রহী। তার পরিকল্পনার অন্যতম অংশ হলো বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণ, যাতে বড় আকারের জেট বিমান অবতরণ করতে পারে। এই প্রস্তাব নতুন নয় গত দুই দশক ধরে এই বিমানবন্দরে জেট বিমান চালুর উদ্যোগ বারবার সামনে এসেছে, তবে প্রতিবারই স্থানীয় বাসিন্দা এবং সিটি হলের বিরোধিতার মুখে তা আটকে গেছে।

নগর উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ টিমা হাটসেন জানান, বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে একটি বিতর্কিত নগর নীতি প্রশ্ন হিসেবে রয়েছে। তবে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে প্রিমিয়ারের আরেকটি মন্তব্য। গত সোমবার তিনি টরন্টো আইল্যান্ডের বাসিন্দাদের, বিশেষ করে যারা সম্প্রসারণের বিরোধিতা করছেন, তাদের “অবৈধ দখলদার” হিসেবে উল্লেখ করেন। তার দাবি, প্রায় ২৬০ জন বাসিন্দা মাত্র বছরে এক ডলার ইজারা দিয়ে ৯৯ বছরের জন্য দ্বীপের জমি ব্যবহার করছেন। তিনি কটাক্ষ করে বলেন, “এই কক্ষে উপস্থিত কেউই নিশ্চয়ই এক ডলার দিয়ে এমন একটি ব্যক্তিগত দ্বীপের মালিক হতে চাইবেন না, যেখানে অন্য কেউ প্রবেশ করতে পারবে না।”

ফোর্ডের এই মন্তব্যে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন আইল্যান্ডের বাসিন্দারা। তারা বলছেন, এটি শুধু তথ্যগতভাবে ভুল নয়, বরং অপমানজনকও। বাস্তবে, দ্বীপের বাসিন্দারা জমির জন্য এককালীন উল্লেখযোগ্য ফি প্রদান করেন, যা বর্তমানে ৬০ হাজার থেকে ৭৮ হাজার কানাডিয়ান ডলারের মধ্যে। এছাড়া ওয়ার্ডস ও অ্যালগনকিন আইল্যান্ড মিলিয়ে প্রায় ২৬২টি বাড়িতে প্রায় ৭০০ জন মানুষ বসবাস করেন যারা বহু বছর ধরে এই এলাকার ঐতিহ্য ও পরিবেশ রক্ষা করে আসছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা জনি জোনাথন প্রিমিয়ারের বক্তব্যকে “সম্পূর্ণ ভুল এবং বিভ্রান্তিকর” বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমরা সেই এক শতাংশ মানুষের জন্য উদ্বিগ্ন নই, যারা ৯৯ শতাংশ মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলতে চায়। আমরা চাই, ফেডারেল সরকারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে বিমানবন্দরের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা হোক, কিন্তু আমাদের মতামত উপেক্ষা করে নয়।”

আরেকজন বাসিন্দা, যিনি নাম প্রকাশ করতে চাননি, বলেন, “বিমানবন্দর সম্প্রসারণের হুমকি নতুন কিছু নয় এটি আসবে এবং চলে যাবে। কিন্তু আমরা এখানেই থাকব। বাস্তবে খুব দ্রুত এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে বলে আমি মনে করি না।”

উল্লেখ্য, বিলি বিশপ টরন্টো সিটি এয়ারপোর্টটি একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় পরিচালিত হয়, যেখানে সিটি অব টরন্টো, টরন্টো পোর্ট অথরিটি এবং কানাডার ফেডারেল সরকার অংশীদার। ২০২৪ সালে সিটি কাউন্সিল এই চুক্তির মেয়াদ আরও ১২ বছর বাড়িয়ে ২০৩৩ সাল পর্যন্ত বহাল রাখার পক্ষে ভোট দেয়।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি শুধুমাত্র একটি অবকাঠামো প্রকল্পের বিতর্ক নয় এটি নগর উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ, স্থানীয় অধিকার এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার একটি জটিল চ্যালেঞ্জ। একদিকে বিমানবন্দর সম্প্রসারণ শহরের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, অন্যদিকে এটি দ্বীপের পরিবেশ ও বাসিন্দাদের জীবনযাত্রায় বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।

সব মিলিয়ে, টরন্টো আইল্যান্ড এবং বিলি বিশপ বিমানবন্দরকে ঘিরে এই বিতর্ক আগামী দিনে আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রিমিয়ারের মন্তব্য ইতোমধ্যেই রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তেজনা বাড়িয়েছে, আর এই ইস্যুতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হলে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে সমন্বয় ও সংলাপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

মাসুদ করিম : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার

Related Articles

Back to top button