পাওনা বুঝে পাননি কর্মীরা

মাসুদ করিম

গত সাত মাস ধরে “স্পিকারস কর্ণার”-এ আসা একাধিক অভিযোগে উঠে এসেছে একই চিত্র কর্মীরা কাজ করলেও বেতন পাচ্ছেন না

অন্টারিওতে কর্মীদের পাওনা না পাওয়ার অভিযোগ নতুন কিছু নয়, তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই সমস্যার ব্যাপকতা এবং দীর্ঘসূত্রিতা নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। গত সাত মাস ধরে “স্পিকারস কর্ণার”-এ আসা একাধিক অভিযোগে উঠে এসেছে একই চিত্র কর্মীরা কাজ করলেও বেতন পাচ্ছেন না, আর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপও যথেষ্ট কার্যকর হচ্ছে না।

এই পরিস্থিতি কর্মীদের জন্য শুধু আর্থিক সংকটই তৈরি করছে না, বরং শ্রম আইনের বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলছে। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠান নিয়ম ভঙ্গ করছে, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্বে থাকা শ্রম মন্ত্রণালয়ের কার্যকারিতা নিয়েও সমালোচনা বাড়ছে।

টরন্টোভিত্তিক একটি নিরাপত্তা সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন নিয়ামত এলাহী। ২০২৫ সালে সেই প্রতিষ্ঠানে এক মাসেরও বেশি সময় কাজ করার পর তিনি বেতন না পেয়ে চরম হতাশায় পড়েন। কয়েক সপ্তাহ কাজ করার পর যখন বারবার বেতন দেওয়ার আশ্বাস দিয়েও তা বাস্তবায়িত হয়নি, তখন বাধ্য হয়ে চাকরি ছেড়ে দেন তিনি। জাস্করন জানান, প্রতিষ্ঠানটি তাকে বারবার আশ্বাস দিয়েছে যে পরে তার পাওনা পরিশোধ করা হবে। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি শেষ পর্যন্ত কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকেছে বাস্তবে তিনি এক টাকাও পাননি।

নিজের পাওনা আদায়ের আশায় জাস্করন শ্রম মন্ত্রণালয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেন। তদন্ত শেষে প্রকাশিত প্রতিবেদনে কোম্পানি স্বীকার করে যে, নিয়ামতের পাওনা তাদের কাছে রয়েছে। এরপর মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠানটিকে ৩০ দিনের মধ্যে বকেয়া পরিশোধের নির্দেশ দেয়। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। নিয়ামতের অভিযোগ, নির্দেশ দেওয়ার পরও তিনি কোনো অর্থ পাননি। বরং কোম্পানিটি কোনো ধরনের শাস্তি ছাড়াই তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। জাস্করন জানান, “মন্ত্রণালয় বলছে তারা টাকা সংগ্রহ করেছে, কিন্তু বাস্তবে আমি এখনো পর্যন্ত কিছুই পাইনি।”

এটি কোনো একক ঘটনা নয়। একটি স্নো রিমুভাল এবং ল্যান্ডস্কেপিং কোম্পানির একাধিক কর্মীও একই ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। তাদের মধ্যে ডজনখানেকের বেশি কর্মী “স্পিকারস কর্ণার”-এ অভিযোগ জানান। এই কর্মীরা প্রথমে শ্রম মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দায়ের করেন এবং দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার পরও যখন কোনো কার্যকর সমাধান পাননি, তখন তারা বিষয়টি জনসমক্ষে আনতে বাধ্য হন।

এই কর্মীদের মধ্যে জিম হ্যানসয় নামের একজন কর্মী অভিযোগ করেন, তিনি এক মাসেরও বেশি সময় ধরে তার পাওনা পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। কিন্তু কোনো অগ্রগতি নেই। জিম হ্যানসয় বলেন, “আমি বুঝতে পারছি না কেন শ্রম মন্ত্রণালয় এই পর্যায়ে এসে বিষয়টি থামাচ্ছে না। যদি শ্রম মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে আমরা কোথায় যাব?”

এই ধারাবাহিক অভিযোগগুলো শ্রম মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা ও জবাবদিহিতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করেছে। অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত শেষ হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শৈথিল্য রয়েছে, যার ফলে নিয়োগদাতারা প্রায় শাস্তিহীনভাবে আইন লঙ্ঘন করে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শ্রম আইন কার্যকর করতে হলে শুধু নির্দেশ জারি করাই যথেষ্ট নয় তা বাস্তবায়নে কঠোর নজরদারি এবং প্রয়োজনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।

অন্টারিওর এই পরিস্থিতি শুধু কয়েকজন কর্মীর ব্যক্তিগত দুর্ভোগ নয়, বরং এটি একটি বৃহত্তর কাঠামোগত সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা অপরিহার্য। অন্যথায়, আইন থাকা সত্ত্বেও তা কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে আর ভুক্তভোগী হবেন সাধারণ কর্মীরাই।

মাসুদ করিম : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার

Related Articles

Back to top button