মূল্যস্ফীতি আরও বেশি হতে পারে

মাসুদ করিম

মার্চ মাসে কানাডার মূল্যস্ফীতির হার প্রত্যাশার তুলনায় কিছুটা নিয়ন্ত্রিত থাকলেও জ্বালানি দামের তীব্র উল্লম্ফন সামগ্রিক অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করেছে।

মার্চ মাসে কানাডার মূল্যস্ফীতির হার প্রত্যাশার তুলনায় কিছুটা নিয়ন্ত্রিত থাকলেও জ্বালানি দামের তীব্র উল্লম্ফন সামগ্রিক অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করেছে। দেশটির পরিসংখ্যান সংস্থা স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, মার্চে বার্ষিক মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২.৪ শতাংশে, যা ফেব্রুয়ারির ১.৮ শতাংশের তুলনায় ০.৫ শতাংশ পয়েন্ট বেশি।

যদিও অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশ আশঙ্কা করেছিলেন যে মূল্যস্ফীতি আরও বেশি হতে পারে, বাস্তবে তা কিছুটা কম থাকলেও জ্বালানি খাতের অস্থিরতা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। বিশেষ করে বৈশ্বিক রাজনৈতিক উত্তেজনা বিশেষত ইরান, ইসরায়েল এবং আমেরিকার মধ্যে চলমান সংঘাত জ্বালানি বাজারে অস্বাভাবিক চাপ সৃষ্টি করেছে।

এই উত্তেজনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালী, যা বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ রুট। ইরানের পক্ষ থেকে এই প্রণালী বন্ধের সিদ্ধান্ত এবং যুদ্ধবিরতি নিয়ে অনিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়িয়ে দেয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে কানাডার অভ্যন্তরীণ বাজারেও।

স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে মাসিক ভিত্তিতে গ্যাসোলিনের দাম বেড়েছে ২১.২ শতাংশ যা সাম্প্রতিক সময়ে একটি রেকর্ড বৃদ্ধি। এই জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধিই মূলত সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি। তবে গ্যাসোলিনের দাম বাদ দিলে মূল্যস্ফীতি দাঁড়াত ২.২ শতাংশে, যা ইঙ্গিত দেয় যে অন্যান্য খাতে মূল্যস্ফীতির চাপ তুলনামূলকভাবে কমছে।

খাদ্য খাতেও কিছুটা স্বস্তির লক্ষণ দেখা গেছে। ফেব্রুয়ারিতে যেখানে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৫.৪ শতাংশ, মার্চে তা কমে ৪ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে সবজির দামে এখনও ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে মরিচ ও শসার মতো তাজা সবজির দাম এক বছরের ব্যবধানে ৭.৮ শতাংশ বেড়েছে। উৎপাদনের জন্য অনুকূল আবহাওয়া না থাকায় সরবরাহ কমে যাওয়াই এই মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে কানাডার কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংক অব কানাডা আগামী ২৯ এপ্রিল সুদের হার সংক্রান্ত তাদের পরবর্তী সিদ্ধান্ত ঘোষণা করবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতোমধ্যেই জানিয়েছে, তারা মার্চের মূল্যস্ফীতির তথ্য গভীরভাবে বিশ্লেষণ করবে এবং বিশেষ করে জ্বালানি খাতের সাময়িক মূল্যবৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী প্রভাব ফেলছে কি না তা মূল্যায়ন করবে।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির বড় অংশই ‘বাহ্যিক ধাক্কা’ বা এক্সটার্নাল শকের ফল যেমন ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও সরবরাহ বিঘ্ন। ফলে যদি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়, তাহলে জ্বালানি দামের চাপ কমতে পারে এবং মূল্যস্ফীতিও আবার নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসতে পারে। তবে বিপরীতভাবে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বা হরমুজ প্রণালী নিয়ে অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে কানাডাসহ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে।

মার্চ মাসের মূল্যস্ফীতির এই বৃদ্ধি আপাতদৃষ্টিতে মাঝারি হলেও এর পেছনের কারণগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। তাই আগামী কয়েক মাসে মূল্যস্ফীতির গতিপথ অনেকটাই নির্ধারিত হবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর।

মাসুদ করিম : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার

Related Articles

Back to top button