মান্দারিন চেইনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা জেমস চিউ প্রয়াত

আলী আহমেদ

কানাডার অন্টারিও প্রদেশে চাইনিজ অল-ইউ-ক্যান-ইট বাফে সংস্কৃতিকে জনপ্রিয় করে তোলা বিখ্যাত ‘মান্দারিন রেস্টুরেন্ট’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট জেমস চিউ আর নেই।

কানাডার অন্টারিও প্রদেশে চাইনিজ অল-ইউ-ক্যান-ইট বাফে সংস্কৃতিকে জনপ্রিয় করে তোলা বিখ্যাত ‘মান্দারিন রেস্টুরেন্ট’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট জেমস চিউ আর নেই। দীর্ঘদিন ধরে পালমোনারি ফিব্রোসিসে ভোগার পর গত ২৯ এপ্রিল ৭৮ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুতে শুধু একটি রেস্টুরেন্ট চেইন নয়, বরং কানাডার বহুসাংস্কৃতিক খাদ্যশিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে বলে মনে করছেন অনেকেই।

মান্দারিন রেস্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষ ইনস্টাগ্রামে দেওয়া এক আবেগঘন বার্তায় জানিয়েছে, “আমরা একজন সত্যিকারের রেস্টুরেন্ট আইকনকে হারিয়েছি। অসাধারণ খাবার এবং নিখুঁত গ্রাহকসেবার যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও অনুপ্রাণিত করবে।”

জেমস চিউর জীবনের গল্পটি ছিল সংগ্রাম, অভিবাসন এবং কঠোর পরিশ্রমের এক অনন্য উদাহরণ। ১৯৬৩ সালে তিনি তার বাবা-মায়ের সঙ্গে তাইওয়ান থেকে কানাডায় পাড়ি জমান। নতুন দেশ, নতুন পরিবেশ সবকিছুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে গিয়ে পরিবারটি মন্ট্রিয়লে বসবাস শুরু করে। অভিবাসী জীবনের শুরুটা সহজ ছিল না। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তার মধ্যেই চিউ নিজের পথ খুঁজতে শুরু করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করার পর তিনি ছোট একটি রেস্টুরেন্ট চালু করেন, যার নাম ছিল ‘সুইট এন সাওয়ার’। শুরুতে এটি ছিল কেবল জীবিকা নির্বাহের উপায়। কিন্তু ধীরে ধীরে রান্না, আতিথেয়তা এবং গ্রাহকসেবার প্রতি তার গভীর ভালোবাসা জন্ম নেয়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সেই ছোট্ট উদ্যোগই পরবর্তীতে তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়ে পরিণত হয়।

১৯৭৯ সালে স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে তিনি অন্টারিওতে চলে আসেন। এ সময় তার ভাই জর্জ চিউ, শ্যালিকা ডায়ানা এবং দীর্ঘদিনের বন্ধু কে.সি. চ্যাঙও তার সঙ্গে যোগ দেন। পরবর্তীতে তারাই সবাই মান্দারিন রেস্টুরেন্টের সহ-প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিতি পান।

অন্টারিওর ব্র্যাম্পটনের কুইন স্ট্রিটে তারা একটি ছোট চাইনিজ রেস্টুরেন্ট কিনে নেন এবং নাম দেন ‘মান্দারিন’। শুরুতে এটি ছিল সাধারণ একটি পারিবারিক রেস্টুরেন্ট। তবে গ্রাহকদের চাহিদা দ্রুত বাড়তে থাকে। ১৯৮৬ সালে দীর্ঘ সারি এবং অতিরিক্ত ভিড় সামাল দিতে তারা নতুন ধারণা হিসেবে চালু করেন ‘চাইনিজ বাফে’। সে সময় এই কনসেপ্টটি ছিল বেশ অভিনব। অল্প সময়ের মধ্যেই এটি বিপুল জনপ্রিয়তা পায় এবং মান্দারিন অন্টারিওজুড়ে পরিচিত একটি ব্র্যান্ডে পরিণত হয়।

জেমস চিউ শুধু ব্যবসা সম্প্রসারণেই মনোযোগ দেননি, বরং তিনি গ্রাহক অভিজ্ঞতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তার বিশ্বাস ছিল, ভালো খাবারের পাশাপাশি আন্তরিক আচরণই একটি রেস্টুরেন্টকে মানুষের মনে জায়গা করে দেয়। সেই দর্শনের কারণেই মান্দারিন রেস্টুরেন্ট বহু অভিবাসী পরিবার, শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় কানাডিয়ানদের কাছে একটি জনপ্রিয় মিলনস্থলে পরিণত হয়।

বর্তমানে অন্টারিওজুড়ে মান্দারিনের ২৯টি শাখা রয়েছে। বছরের পর বছর ধরে এটি শুধু একটি রেস্টুরেন্ট নয়, বরং কানাডার বহুসাংস্কৃতিক সমাজের প্রতীক হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছে। বিশেষ করে পরিবারকেন্দ্রিক পরিবেশ, বিশাল খাবারের আয়োজন এবং সেবার মানের কারণে এটি অসংখ্য মানুষের প্রিয় গন্তব্যে পরিণত হয়।

খাদ্যশিল্প বিশ্লেষকদের মতে, জেমস চিউর সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল অভিবাসী উদ্যোক্তাদের জন্য একটি উদাহরণ তৈরি করা। শূন্য থেকে শুরু করে কীভাবে পরিশ্রম, দূরদৃষ্টি এবং গ্রাহকসেবার মাধ্যমে একটি ছোট ব্যবসাকে বৃহৎ প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়া যায় তার জীবন সেই গল্পই বলে।

তার মৃত্যুতে কানাডার রেস্টুরেন্ট শিল্পে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সহকর্মী, কর্মচারী এবং দীর্ঘদিনের গ্রাহকরা তাকে স্মরণ করছেন একজন দূরদর্শী উদ্যোক্তা, মানবিক নেতা এবং আতিথেয়তার প্রতীক হিসেবে। যদিও জেমস চিউ আর নেই, তবে তার গড়ে তোলা মান্দারিন রেস্টুরেন্ট এবং তার দর্শন আগামী বহু বছর ধরে মানুষের মনে বেঁচে থাকবে।

Related Articles

Back to top button