স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নথি চেয়ে আবেদন অন্টারিওর নতুন আইনে প্রত্যাখ্যান

মাসুদ করিম

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সিলভিয়া জোন্স

অন্টারিও প্রদেশে ফ্রিডম অব ইনফরমেশন (এফওআই) আইন নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। প্রদেশটির নতুন ও অধিকতর নিয়ন্ত্রণমূলক তথ্য অধিকার আইন এবার প্রকাশ হতে দিল না হাসপাতালগুলোর সম্ভাব্য ব্যয় সংকোচন পরিকল্পনার নথিও। সমালোচকদের মতে, সরকারের এই অবস্থান জনস্বাস্থ্য খাতের সংকট সম্পর্কে জনগণকে অন্ধকারে রাখার আরেকটি উদাহরণ।

অন্টারিওজুড়ে বর্তমানে স্বাস্থ্য খাত গভীর আর্থিক চাপে রয়েছে। সরকারি হিসাব ও হাসপাতাল প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন অনুযায়ী, প্রদেশের ৭০ শতাংশের বেশি হাসপাতাল চলতি অর্থবছরে ঘাটতির মুখে পড়ার আশঙ্কা করছে। এই পরিস্থিতিতে প্রাদেশিক স্বাস্থ্যমন্ত্রী সিলভিয়া জোন্স হাসপাতালগুলোকে আগামী তিন বছরের মধ্যে বাজেট ভারসাম্যে আনার পরিকল্পনা জমা দিতে নির্দেশ দেন।

মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে হাসপাতালগুলোকে বলা হয়েছিল, প্রথমে এমন ব্যয় সাশ্রয়ের উপায় খুঁজতে হবে যা “কম ঝুঁকিপূর্ণ” এবং যাতে সম্মুখসারির স্বাস্থ্যকর্মীদের চাকরি বা রোগীদের সেবার মান ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। প্রশাসনিক খরচ কমানো, সরবরাহ ব্যবস্থায় পরিবর্তন, চুক্তিভিত্তিক সেবার পুনর্বিন্যাস কিংবা অবকাঠামোগত ব্যয়ের পুনর্মূল্যায়নের মতো পদক্ষেপকে অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়।

তবে নির্দেশনায় এটাও স্পষ্ট করে বলা হয়েছিল, যদি কম ঝুঁকির সব পদক্ষেপ গ্রহণের পরও বাজেট ঘাটতি কমানো সম্ভব না হয়, তাহলে হাসপাতালগুলো রোগীসেবায় প্রভাব ফেলতে পারে এমন “উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ” পদক্ষেপও বিবেচনায় আনতে পারবে। এই অংশটিই জনমনে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ স্বাস্থ্যখাতে “উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ” ব্যয় সংকোচন বলতে অনেক সময় কর্মীসংখ্যা হ্রাস, সেবা সীমিতকরণ কিংবা অপেক্ষার সময় বৃদ্ধি বোঝায়।

এই প্রেক্ষাপটে গত বছরের নভেম্বরে সংবাদ সংস্থা দি কানাডিয়ান প্রেস হাসপাতালগুলোর পরিকল্পনা-সংক্রান্ত নথি চেয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দপ্তরে ফ্রিডম অব ইনফরমেশন আবেদন জমা দেয়। আবেদনটির লক্ষ্য ছিল জানতে চাওয়া প্রদেশের হাসপাতালগুলো বাস্তবে কী ধরনের কাটছাঁটের পরিকল্পনা করছে এবং তা রোগীসেবায় কতটা প্রভাব ফেলতে পারে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আবেদনটি গ্রহণের পর নথি সরবরাহের জন্য ৯০ দিন সময় নেয়। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী, চলতি বছরের ১০ মার্চের মধ্যে নথি সরবরাহ বা অন্তত অগ্রগতির তথ্য জানানোর কথা ছিল। কিন্তু সময়সীমা পার হলেও মন্ত্রণালয়ের ফ্রিডম অব ইনফরমেশন কার্যালয় থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক জবাব আসেনি। এমনকি হালনাগাদ তথ্য জানতে পাঠানো একাধিক অনুস্মারক অনুরোধেরও কোনো উত্তর দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

এরই মধ্যে পরিস্থিতিকে আরও বিতর্কিত করে তোলে অন্টারিও সরকারের নতুন আইন। প্রিমিয়ার, কেবিনেট মন্ত্রী এবং তাদের রাজনৈতিক কর্মীদের অফিসকে ফ্রিডম অব ইনফরমেশন অনুরোধের আওতার বাইরে রাখার উদ্দেশ্যে উত্থাপিত বিলটি দ্রুত আইনে পরিণত হয়। সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো আইনটি “ভূতাপেক্ষ” ভিত্তিতে ১৯৮৮ সাল থেকে কার্যকর বলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ, অতীতের বহু নথির ক্ষেত্রেও এই আইন প্রযোজ্য হবে।

ফলে শুধু ভবিষ্যতের অনুরোধ নয়, ইতোমধ্যে জমা দেওয়া বহু তথ্য অধিকার আবেদনও কার্যত অকার্যকর হয়ে যাচ্ছে। সমালোচকদের ভাষায়, এটি কেবল একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়; বরং সরকারের জবাবদিহিতা সীমিত করার একটি বড় রাজনৈতিক পদক্ষেপ।

স্বচ্ছতা ও নাগরিক অধিকারের পক্ষে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন বলছে, এই আইন গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার জন্য বিপজ্জনক নজির তৈরি করতে পারে। তাদের মতে, জনগণের করের অর্থে পরিচালিত হাসপাতালগুলো কীভাবে ব্যয় সংকোচনের পরিকল্পনা করছে, তা জানার অধিকার জনগণের অবশ্যই রয়েছে। বিশেষ করে যখন স্বাস্থ্যসেবার মান, অপেক্ষার সময় এবং কর্মীদের ওপর বাড়তি চাপ নিয়ে ইতোমধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।

অন্যদিকে সরকারের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো দাবি করছে, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক চাপ ও প্রশাসনিক জটিলতা থেকে মুক্ত রাখতেই এই পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে বিরোধী দল ও স্বচ্ছতা আন্দোলনকারীরা এই ব্যাখ্যা মানতে নারাজ। তাদের মতে, সরকারের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো সংবেদনশীল নথিপত্র জনসমক্ষে আসা ঠেকানো।

অন্টারিওর স্বাস্থ্যখাত বর্তমানে এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে বাজেট ঘাটতি ও ব্যয় বৃদ্ধি, অন্যদিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা বাড়ছে দ্রুতগতিতে। এই অবস্থায় ব্যয় সংকোচনের পরিকল্পনা কীভাবে বাস্তবায়ন হবে এবং তার প্রভাব কতটা গভীর হতে পারে তা নিয়ে জনগণের উদ্বেগ স্বাভাবিক। কিন্তু তথ্য অধিকার আইনের নতুন সীমাবদ্ধতা সেই উদ্বেগ দূর করার বদলে বরং অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে তুলছে।

মাসুদ করিম : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার

Related Articles

Back to top button