তাইওয়ান যাচ্ছেন কনজার্ভেটিভ এমপি মাইকেল চং

কামরুল ইসলাম

কানাডার কনজারভেটিভ পার্টির প্রভাবশালী সংসদ সদস্য মাইকেল চং এ সপ্তাহে তাইওয়ান সফরে যাচ্ছেন।

কানাডার কনজারভেটিভ পার্টির প্রভাবশালী সংসদ সদস্য মাইকেল চং এ সপ্তাহে তাইওয়ান সফরে যাচ্ছেন। এই সফরকে তিনি শুধু কূটনৈতিক সফর হিসেবে নয়, বরং কানাডার সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারের প্রতীক হিসেবেও তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, বিদেশি কোনো রাষ্ট্র কানাডার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কোথায় যাওয়া উচিত বা উচিত নয় তা নির্ধারণ করতে পারে না।

চংয়ের এই সফরকে ঘিরে নতুন করে সামনে এসেছে কানাডা-চীন সম্পর্কের টানাপোড়েন, বিশেষ করে তাইওয়ান প্রশ্নে দুই দেশের অবস্থানগত পার্থক্য। গত মাসে কানাডায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত এক সাক্ষাৎকারে সতর্ক করে বলেছিলেন, কানাডার কোনো সংসদ সদস্যের তাইওয়ান সফর দুই দেশের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত অংশীদারিত্ব চুক্তিকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। এই মন্তব্যকে অনেকেই কানাডার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে চীনের সরাসরি হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।

নিজের সফর ঘোষণা করে দেওয়া এক বিবৃতিতে মাইকেল চং বলেন, “কানাডিয়ান এমপিরা কোথায় ভ্রমণ করবেন, সে বিষয়ে বিদেশি সরকারের নির্দেশনা কানাডিয়ানরা মেনে নেয় না।” তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল যে, তিনি চীনের সতর্কবার্তাকে রাজনৈতিক চাপ হিসেবে বিবেচনা করছেন এবং সেই চাপের বিরুদ্ধে অবস্থান জানাতেই এই সফরকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন।

চং দীর্ঘদিন ধরেই চীনের মানবাধিকার নীতি, বিদেশি প্রভাব বিস্তার এবং তাইওয়ান ইস্যুতে বেইজিংয়ের অবস্থানের সমালোচক হিসেবে পরিচিত। কয়েক বছর আগে চীনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কারণে তিনি ব্যক্তিগতভাবে বেইজিংয়ের নিষেধাজ্ঞার মুখেও পড়েছিলেন। ফলে তাঁর এই সফরকে অনেক বিশ্লেষক প্রতীকী রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেও দেখছেন।

তাইওয়ান ইস্যু বর্তমানে আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম সংবেদনশীল বিষয়। তাইওয়ান নিজেদের একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচালনা করলেও চীন দ্বীপটিকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে। বেইজিং বহুদিন ধরেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপর চাপ দিয়ে আসছে যাতে কোনো দেশ তাইওয়ানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে না তোলে।

কানাডার অবস্থানও এ ক্ষেত্রে কৌশলী ও ভারসাম্যপূর্ণ। অটোয়া সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে “এক চীন নীতি” অনুসরণ করে, যার আওতায় তারা তাইওয়ানকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। তবে একই সঙ্গে কানাডা তাইওয়ানের ওপর চীনের সার্বভৌমত্বের দাবিকেও সরাসরি সমর্থন করে না। অর্থাৎ, কানাডা এমন একটি অবস্থান বজায় রেখেছে যেখানে তারা চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ধরে রাখার পাশাপাশি তাইওয়ানের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও অনানুষ্ঠানিক সম্পর্কও জোরদার করছে।

এই সম্পর্কের অর্থনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। কানাডার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে তাইওয়ান ছিল কানাডার ১৫তম বৃহৎ বাণিজ্য অংশীদার। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে তাইওয়ান কানাডার ষষ্ঠ বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে অবস্থান করছে। প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর, কৃষিপণ্য ও উন্নত শিল্পখাতে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য দ্রুত বাড়ছে।

মাইকেল চংয়ের এই সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে যখন পশ্চিমা দেশগুলো ধীরে ধীরে তাইওয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃশ্যমানভাবে জোরদার করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সংসদ সদস্যদের সাম্প্রতিক তাইওয়ান সফরও একই ধরনের রাজনৈতিক বার্তা বহন করেছে। কানাডার ক্ষেত্রেও এই সফর শুধু কূটনৈতিক যোগাযোগ নয়, বরং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সংসদীয় স্বাধীনতা এবং বিদেশি প্রভাব মোকাবিলার প্রশ্নে একটি অবস্থান হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে এই সফর চীন-কানাডা সম্পর্ককে আরও উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে। ইতোমধ্যে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা তৎপরতা নিয়ে নানা বিতর্ক চলছে। ফলে তাইওয়ান ইস্যুতে নতুন এই উত্তাপ ভবিষ্যতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

Related Articles

Back to top button