অনুসন্ধানে উঠে এল টরন্টো বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ঘাটতি

আলী আহমেদ

কানাডার সবচেয়ে ব্যস্ত বিমানবন্দরগুলোর অন্যতম টরন্টো পিয়ারসন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী এই বিমানবন্দর দিয়ে যাতায়াত করেন।

কানাডার সবচেয়ে ব্যস্ত বিমানবন্দরগুলোর অন্যতম টরন্টো পিয়ারসন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী এই বিমানবন্দর দিয়ে যাতায়াত করেন। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখানে রয়েছে বহুস্তরীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা। উড়োজাহাজে ওঠার আগে যাত্রীদের ব্যাগেজ এক্স-রে স্ক্যান করা হয়, শরীর তল্লাশি করা হয়, এমনকি পানির বোতলের মতো সাধারণ জিনিসও অনেক সময় নিরাপত্তার কারণে বাজেয়াপ্ত করা হয়। বিমানবন্দরের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় রাখা হয়েছে যাতে সন্দেহজনক কোনো কার্যকলাপ দ্রুত শনাক্ত করা যায়।

তবে এত কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যেও একটি গুরুতর দুর্বলতার চিত্র উঠে এসেছে এক প্রতিবেদনে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র বিমানবন্দরের ভেতরে কর্মরত কিছু অসাধু কর্মীকে ব্যবহার করে মাদক পাচারের মতো গুরুতর অপরাধ পরিচালনা করছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে, যাত্রীদের জন্য যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা এত কঠোর, কর্মীদের ক্ষেত্রে তা কেন সমানভাবে কার্যকর নয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় কাজ করা কর্মীরা এমন সব স্থানে প্রবেশাধিকার পান যেখানে সাধারণ যাত্রীদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এর মধ্যে রয়েছে লাগেজ হ্যান্ডলিং জোন, কার্গো এলাকা এবং উড়োজাহাজের কাছাকাছি অপারেশনাল অঞ্চল। এই কর্মীদের অনেকেই বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বেষ্টনীর ভেতরে কাজ করলেও কাজ শেষে বের হওয়ার সময় নিয়মিত তল্লাশির মুখোমুখি হন না।

ডব্লিউ৫-এর সঙ্গে কথা বলেছেন “চার্লস” ছদ্মনামে পরিচিত এক র‌্যাম্প কর্মী, যিনি প্রায় দুই দশক ধরে পিয়ারসন বিমানবন্দরে কাজ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দায়িত্ব শেষ হওয়ার পর তিনি সরাসরি টার্মিনালের একটি দরজা দিয়ে বেরিয়ে যান এবং পার্কিং এলাকায় পৌঁছাতে ট্রেনে ওঠেন। পুরো প্রক্রিয়ায় কেউ তাঁর শরীর বা বহন করা সামগ্রী তল্লাশি করে না।

চার্লসের দাবি, কোনো অসাধু কর্মী চাইলে খুব সহজেই উড়োজাহাজ থেকে মাদকভর্তি একটি স্যুটকেস নামিয়ে বিমানবন্দর এলাকা থেকে বের করে নিতে পারেন। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝাতে তিনি বলেন, কর্মীদের মধ্যে প্রায়ই রসিকতা করে বলা হয় যে কেউ চাইলে একটি “ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র” নিয়েও বেরিয়ে যেতে পারবে, অথচ তাকে থামানোর মতো কেউ থাকবে না। চার্লস আরও জানান, পিয়ারসনের উচ্চ-নিরাপত্তা এলাকায় প্রায় ২০ বছর কাজ করার সময়ে বিমানবন্দর ত্যাগের সময় মাত্র একবার তাঁর তল্লাশি হয়েছিল। এই তথ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কাঠামো ঐতিহাসিকভাবে যাত্রীদের কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। ফলে কর্মীদের চলাচল ও কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে অনেক ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। অপরাধচক্রগুলো এই দুর্বলতাকেই কাজে লাগানোর চেষ্টা করে। পুলিশি সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার এই ফাঁক সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের জন্য একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মাদক পাচার চক্রগুলো বিমানবন্দরের ভেতরের কর্মীদের ব্যবহার করে অবৈধ পণ্য পরিবহনের পথ খুঁজে নেয়।

ইয়র্ক রিজিয়নাল পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত পরিদর্শক ডিয়েটার বোয়েহেইম দীর্ঘদিন টরন্টো এয়ারপোর্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে কাজ করেছেন এবং বিমানবন্দরভিত্তিক দুর্নীতি ও অপরাধ তদন্তে যুক্ত ছিলেন। তাঁর মতে, বিমানবন্দরগুলো মূলত যাত্রীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য পরিকল্পিত। কিন্তু কর্মীদের ওপর একই মাত্রার নজরদারি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তিনি বলেন, “বিমানবন্দরের সামনের অংশ, অর্থাৎ যেখান দিয়ে যাত্রীরা চলাচল করেন, সেটি অত্যন্ত সুরক্ষিত। কিন্তু পেছনের অংশ, যেখানে কর্মীদের অবাধ প্রবেশাধিকার রয়েছে, সেখানে নিরাপত্তার মাত্রা তুলনামূলকভাবে অনেক কম। একজন কর্মী অনেক ক্ষেত্রেই নিজের ইচ্ছামতো আসা-যাওয়া করতে পারেন।”

আধুনিক বিমানবন্দরে নিরাপত্তা শুধু যাত্রীদের সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। যেসব কর্মী প্রতিদিন সরাসরি উড়োজাহাজ, লাগেজ ও কার্গোর সংস্পর্শে থাকেন, তাদের ক্ষেত্রেও নিয়মিত তল্লাশি, আকস্মিক নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং উন্নত নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। কারণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থার সবচেয়ে শক্তিশালী অংশও দুর্বল হয়ে পড়ে যদি ভেতরের কোনো ব্যক্তি অপরাধীদের সহযোগী হয়ে ওঠেন। পিয়ারসন বিমানবন্দরকে ঘিরে উঠে আসা এই অভিযোগ শুধু কানাডার জন্য নয়, বিশ্বের অন্যান্য আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোর জন্যও একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বর্তমানে এই বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে যে, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যাত্রীদের পাশাপাশি কর্মীদেরও সমান গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ ও তল্লাশির আওতায় আনা প্রয়োজন কি না। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে মাদক পাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।

Related Articles

Back to top button