
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড কম্পিউটিং এবং তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোর দ্রুত বিকাশের মধ্য দিয়ে কানাডা নিজেকে ভবিষ্যতের ডিজিটাল অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে। তবে এই অগ্রযাত্রার মাঝেই সামনে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা দেশটির বিপুল পরিমাণ তথ্য সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ এবং ডিজিটাল সেবার নিয়ন্ত্রণ ক্রমশ কয়েকটি বিদেশি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কানাডার ডিজিটাল অবকাঠামোর একটি বড় অংশ বর্তমানে বিদেশি, বিশেষ করে মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর হাতে কেন্দ্রীভূত। গবেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত স্বাধীনতা এবং ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। সরকারি প্রশাসন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, গবেষণা, আর্থিক খাত এবং শিল্প উৎপাদন সব ক্ষেত্রেই এআই এখন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু এআই পরিচালনার জন্য প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ তথ্য, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং অবকাঠামো এবং নিরাপদ তথ্যভান্ডার।
যদি এসব অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ দেশের বাইরে থাকে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে একটি দেশের নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। কারণ তথ্যের প্রবাহ, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং উদ্ভাবনের ভিত্তি তখন বহুলাংশে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হয়ে যায়। এই প্রেক্ষাপটেই কানাডা সরকার চলতি সপ্তাহে একটি জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা রূপরেখা প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সরকারি সূত্রগুলোর ধারণা, নতুন পরিকল্পনায় দেশীয় প্রযুক্তি অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ব্যবস্থাপনায় স্বনির্ভরতা অর্জনের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাবে।
গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কানাডার উন্মুক্ত তথ্যভান্ডার ও ক্লাউডভিত্তিক সেবার বড় অংশ বর্তমানে মাত্র তিনটি মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সরকারি সংস্থা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং গবেষণা সংস্থাগুলোর একটি বড় অংশ তাদের তথ্য সংরক্ষণ ও পরিচালনার জন্য এসব প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বের অনেক দেশেই বিদেশি ক্লাউড সেবার ব্যবহার বাড়ছে। তবে কানাডার ক্ষেত্রে নির্ভরতার মাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশি। এর ফলে দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ কার্যত বিদেশি অবকাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে।
গবেষকদের ভাষায়, প্রযুক্তিগত নির্ভরতা শুধু ব্যবসায়িক সুবিধার প্রশ্ন নয়। বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রযুক্তি নিজেই একটি কৌশলগত সম্পদে পরিণত হয়েছে। তাই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও ডিজিটাল সেবা যদি সীমিত সংখ্যক বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে, তাহলে তা ভবিষ্যতে জাতীয় স্বার্থের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গত কয়েক বছরে কানাডা সরকার বিদেশি প্রযুক্তি সেবা ক্রয়ের পেছনে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছে। সরকারি বিভিন্ন প্রকল্প, তথ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা এবং ক্লাউডভিত্তিক সেবা পরিচালনায় এই ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সমালোচকদের মতে, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে দেশীয় প্রযুক্তি শিল্পের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। কারণ বিদেশি প্ল্যাটফর্মের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা স্থানীয় উদ্ভাবন, গবেষণা এবং প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের জন্য প্রতিযোগিতার সুযোগ সীমিত করে দেয়। তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে যদি দেশীয় প্রযুক্তি খাতকে শক্তিশালী করতে হয়, তাহলে শুধু বিদেশি সেবা ক্রয় নয়, বরং নিজস্ব অবকাঠামো নির্মাণ এবং গবেষণা বিনিয়োগ বাড়ানোর দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
বর্তমান সময়ে অনেক দেশই ‘ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব’ বা প্রযুক্তিগত স্বাধীনতার ধারণাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এর অর্থ হলো, একটি দেশ যেন তার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর ওপর নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারে। এআই-নির্ভর ভবিষ্যতে এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ আগামী দিনের অর্থনীতি, প্রশাসন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার বড় অংশই তথ্য ও গণনাশক্তির ওপর নির্ভর করবে। যদি সেই তথ্য ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে কোনো আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক সংকটের সময় একটি দেশ অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে। তাই এখন থেকেই নিজস্ব সক্ষমতা গড়ে তোলা জরুরি বলে মনে করছেন গবেষকরা।
প্রতিবেদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ হলো প্রযুক্তি বাজারে প্রকৃত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা। গবেষকদের মতে, বর্তমানে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর প্রভাব এতটাই বেশি যে নতুন প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাজারে প্রবেশ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এ কারণে এমন নীতি গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যাতে ব্যবহারকারীরা সহজেই একটি সেবা প্রদানকারী থেকে অন্যটিতে স্থানান্তর হতে পারেন। তথ্য স্থানান্তরের সুবিধা বৃদ্ধি এবং উন্মুক্ত মানদণ্ড অনুসরণের মাধ্যমে বাজারে নতুন প্রতিযোগীদের প্রবেশের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব বলে তারা মনে করেন। এতে একদিকে যেমন ব্যবহারকারীরা বেশি বিকল্প পাবেন, অন্যদিকে প্রযুক্তি খাতেও উদ্ভাবনের গতি বাড়বে।
তবে গবেষকরা একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তাও দিয়েছেন। তাদের মতে, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে কেবল দেশীয় বড় করপোরেট গোষ্ঠীর হাতে নিয়ন্ত্রণ তুলে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন এমন একটি কাঠামো, যেখানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত হবে। অন্যথায় প্রযুক্তিগত নির্ভরতার চরিত্র বদলালেও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ থেকে যাবে, যা দীর্ঘমেয়াদে একই ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রযুক্তিগত স্বাধীনতা কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রশ্ন নয়; এটি জাতীয় সক্ষমতা, উদ্ভাবনী শক্তি এবং ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। সেজন্য কানাডার সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিদেশি প্রযুক্তি অবকাঠামোর সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি কীভাবে নিজস্ব তথ্যভান্ডার, গবেষণা সক্ষমতা, ক্লাউড অবকাঠামো এবং এআই প্রযুক্তির ভিত্তি শক্তিশালী করা যায়। নতুন জাতীয় এআই রূপরেখা সেই পথনকশা কতটা স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে পারে, এখন সেদিকেই নজর বিশ্লেষক ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের। কারণ ডিজিটাল ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার করাই যথেষ্ট নয়, সেই প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণও নিজের হাতে রাখতে হবে।
মাসুদ করিম : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার



