তহবিল সংকটে ধ্বংসের মুখে কানাডার গণপরিবহন

মাহবুবুল আলম

কানাডার প্রধান প্রধান শহরের গণপরিবহন ব্যবস্থা সামনে এক গভীর তহবিল সংকটে পড়তে যাচ্ছে এমনটাই সতর্ক করেছে সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন

কানাডার প্রধান প্রধান শহরের গণপরিবহন ব্যবস্থা সামনে এক গভীর তহবিল সংকটে পড়তে যাচ্ছে  এমনটাই সতর্ক করেছে সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন। নতুন ট্রানজিট লাইন, সাবওয়ে সম্প্রসারণ ও বাস র‌্যাপিড ট্রানজিটের মতো অবকাঠামো প্রকল্পে হাজার হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করা হলেও, পরিচালন রাজস্বের টেকসই উৎস না থাকায় এই ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।

লিডিং মোবিলিটি কানাডা প্রকাশিত মে মাসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেসব শহর বর্তমানে তাদের বিদ্যমান বাস ও ট্রেন সেবা সচল রাখতে হিমশিম খাচ্ছে, তাদের জন্য নতুন ১২ হাজার কোটি ডলারের সম্প্রসারণ পরিকল্পনা কার্যত কোনো টেকসই সমাধান নয়।

প্রতিবেদনের সহ-লেখক ডেভিড কুপার সতর্ক করে বলেন, “অধিকাংশ শহরের ট্রানজিট তহবিল আসে যাত্রী ভাড়া ও সম্পত্তি কর থেকে। কিন্তু রাজস্বের বিকল্প উৎস নেই বললেই চলে। কেবল নতুন লাইন বা স্টেশন নির্মাণে বিনিয়োগ করলে তা দীর্ঘমেয়াদে কোনো সুফল দেবে না, যদি বর্তমান ব্যবস্থাকে সচল রাখার সামর্থ্য না থাকে।”

প্রতিবেদনটি কানাডার আটটি প্রধান নগর ভ্যানকুভার, ক্যালগেরি, এডমন্টন, উইনিপেগ, অটোয়া, টরন্টো, মন্ট্রিয়ল ও হ্যালিফ্যাক্স এর ট্রানজিট বাজেট ও রাজস্ব কাঠামো বিশ্লেষণ করেছে। ফলাফল উদ্বেগজনক ১) ক্যালগেরি: ২০২৩ সালে ট্রানজিট ঘাটতি ছিল ৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার। ২) টরন্টো: একই বছরে ঘাটতি দাঁড়ায় ৩৬ কোটি ৬০ লাখ ডলারে। ৩) মন্ট্রিয়ল: ২০২৫ সালের মধ্যে ঘাটতি ৫৬ কোটি ডলার ছাড়াবে, আর ২০২৮ নাগাদ তা প্রায় ৭০ কোটি ডলারে পৌঁছাবে বলে পূর্বাভাস। ৪) হ্যালিফ্যাক্স: ২০২৬ সালের মধ্যে ২ কোটি ২০ লাখ ডলারের ঘাটতি হবে যা তাদের মোট বাজেটের ১৫% এরও বেশি। ৫) ভ্যানকুভার: ২০২৬ সালেই কাঠামোগত ঘাটতি ৬০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে। ৬) এডমন্টন: ২০৩৩ সালের মধ্যে বার্ষিক ঘাটতি হতে পারে ১৭ কোটি ৪০ লাখ ডলার। ৭) উইনিপেগ: নতুন সম্প্রসারণ প্রকল্পের কারণে বার্ষিক ব্যয় বেড়ে যাবে অন্তত ৩ কোটি ৭০ লাখ ডলার।

অটোয়াতে নতুন লাইট রেল, হ্যালিফ্যাক্সে বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট বা টরন্টোতে সাবওয়ে সম্প্রসারণ এসব প্রকল্প শুনতে যতই আকর্ষণীয় হোক, বাস্তবে এগুলো শহরগুলোর পরিচালন ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে স্থানীয় প্রশাসনগুলো। ভ্যানকুভারের হিসাবে, কেবল বাস ও লাইট রেল সম্প্রসারণে অতিরিক্ত ১২০ কোটি ডলার খরচ হতে পারে। অন্যদিকে ক্যালগেরি জানিয়েছে, আগামী ১০ বছরে তাদের পরিচালন ব্যয় ১২ কোটি ৭০ লাখ ডলার পর্যন্ত বেড়ে যাবে।

ফেডারেল সরকার গণপরিবহন সম্প্রসারণে বড় অঙ্কের অনুদান বরাদ্দ করলেও, স্থানীয় প্রশাসনগুলো বলছে সমস্যা কেবল সম্প্রসারণ নয়, বরং বিদ্যমান সেবা টিকিয়ে রাখার সক্ষমতা। যাত্রী ভাড়া ও সম্পত্তি করের ওপর নির্ভরশীলতা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে, এই নগরগুলো শিগগিরই কার্যত আর্থিক অচলাবস্থায় পড়বে।

বিশ্লেষণটি সতর্ক করেছে “যদি বিকল্প তহবিলের উৎস তৈরি না হয়, তবে কানাডার নগর ট্রানজিট ব্যবস্থা ধীরে ধীরে ভেঙে পড়বে। সম্প্রসারণের নামেই কেবল বিপুল অর্থ ব্যয় হবে, কিন্তু নাগরিকদের সেবা বাস্তবে আরও সীমিত হয়ে পড়বে।”

এখন কানাডার নগর প্রশাসনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, অবকাঠামো সম্প্রসারণের পাশাপাশি পরিচালন বাজেটের টেকসই সমাধান নিশ্চিত করা। নচেৎ, কোটি কোটি ডলারের নতুন বিনিয়োগও নাগরিকদের দৈনন্দিন যাতায়াত সংকট দূর করতে পারবে না। বরং সেবার মান ক্রমে অবনতি ঘটবে, আর গণপরিবহন হারাবে তার মূল উদ্দেশ্য সাধারণ মানুষের সহজ ও সাশ্রয়ী চলাচলের মাধ্যম হিসেবে।

Related Articles

Back to top button