
দেশজুড়ে প্রবল সমালোচনা ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের তীব্র আপত্তির মুখে কানাডার ফেডারেল সরকার অবশেষে পিছু হটল। সাবেক আবাসিক স্কুলগুলোর প্রাঙ্গণে অচিহ্নিত কবর ও নিখোঁজ শিশুদের অনুসন্ধানের জন্য বরাদ্দ তহবিল সীমিত করার যে সিদ্ধান্ত সরকার সম্প্রতি নিয়েছিল, তা বাতিল করা হয়েছে। এই পদক্ষেপকে অনেকেই বলছেন, “ন্যায়বিচার ও পুনর্মিলনের পথে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাবর্তন।”
কানাডার আবাসিক স্কুল ব্যবস্থা দেশের ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়। উনবিংশ শতাব্দীর শেষ থেকে ১৯৯০-এর দশক পর্যন্ত পরিচালিত এসব স্কুলে আদিবাসী শিশুদের পরিবার থেকে জোর করে আলাদা করে এনে “সমন্বয়” (assimilation) করার নামে কঠোর শারীরিক, মানসিক ও সাংস্কৃতিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল। অনেক শিশু নিখোঁজ হয়, হাজারো শিশুর কবর আজও অচিহ্নিত।
এই ইতিহাসের দায় স্বীকার করে সরকার ২০১৫ সালে “ত্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন” গঠন করে, যার অন্যতম সুপারিশ ছিল এসব অচিহ্নিত কবর শনাক্ত করা এবং মৃত শিশুদের স্মৃতি সংরক্ষণে পদক্ষেপ নেওয়া। এই উদ্দেশ্যে গঠিত হয় “রেসিডেন্সিয়াল স্কুলস মিসিং চিলড্রেন কমিউনিটি সাপোর্ট ফান্ড” যার মাধ্যমে প্রতি আদিবাসী কমিউনিটিকে বছরে সর্বোচ্চ ৩০ লাখ কানাডীয় ডলার পর্যন্ত তহবিল দেওয়া হতো।
কিন্তু সম্প্রতি সরকার ঘোষণা দেয় যে, এই তহবিলের সীমা কমিয়ে মাত্র ৫ লাখ ডলারে নামানো হবে। সরকারের যুক্তি ছিল তহবিল সীমিত করলে আরও বেশি কমিউনিটি এ প্রকল্পে অংশ নিতে পারবে। কিন্তু এই সিদ্ধান্তে ক্ষোভে ফেটে পড়ে আদিবাসী নেতারা। তারা বলেন, এটি শুধু অযৌক্তিক নয়, বরং “অতীতের অবমাননার পুনরাবৃত্তি।”
অ্যাসেম্বলি অব ম্যানিটোবা চিফস (AMC)-এর ডেপুটি গ্র্যান্ড চিফ বেটসি কেনেডি এক বিবৃতিতে বলেন, “এই সিদ্ধান্ত কেবল হতাশাজনক নয়, বরং আবাসিক স্কুলের কারণে যেসব পরিবার তাদের সন্তান হারিয়েছে, তাদের প্রতি অপমানজনক। এটি যেন সরকার অতীতের বাস্তবতাকে অস্বীকার করছে।”
তীব্র সমালোচনার মুখে শেষ পর্যন্ত সরকার তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে। ইন্ডিজেনাস রিলেশন্স মন্ত্রী গ্যারি আনান্দাসাঙ্গারি জানান, “আমরা আদিবাসী নেতা ও কমিউনিটিগুলোর স্পষ্ট ও জোরালো উদ্বেগ শুনেছি। সরকার এখন তহবিলের ওপর আর কোনো সীমা বা বিধিনিষেধ রাখছে না।”
তিনি আরও বলেন, “যেসব শিশু কখনোই ঘরে ফেরেনি, তাদের চিহ্নিত করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। এই প্রতিশ্রুতিতে যেন কোনো খামতি না থাকে, সেই কারণেই সিদ্ধান্ত বদল করা হয়েছে।”
মন্ত্রী স্বীকার করেন যে, সরকার শুরুতে যথেষ্ট নমনীয়তা দেখাতে পারেনি এবং “কমিউনিটিগুলো নিজেরাই সবচেয়ে ভালো জানে কীভাবে এই অনুসন্ধান চালাতে হবে।” তাই তাদের হাতে এখন পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও প্রয়োজনীয় অর্থ তুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
ম্যানিটোবার আদিবাসী সংগঠনগুলো সরকারের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারকে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের মতে, এটি শুধু নীতিগত পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্র ও ফার্স্ট নেশন সম্প্রদায়ের মধ্যে আস্থা পুনর্গঠনের এক প্রতীকী মুহূর্ত।
একটি বিবৃতিতে অ্যাসেম্বলি অব ম্যানিটোবা চিফস বলেছে, “এই পরিবর্তন প্রমাণ করে যে, ফেডারেল সরকার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর শুনছে এবং সংলাপ ও সহযোগিতার মাধ্যমে অতীতের ক্ষত নিরাময়ে কাজ করতে চায়।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের এই সিদ্ধান্ত শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি নৈতিক ও ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতার প্রকাশ। ত্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশনের অন্যতম মূল বার্তা ছিল “সত্যের স্বীকারোক্তি ছাড়া নিরাময় সম্ভব নয়।” সেই পথেই কানাডা আবার ফিরে এসেছে বলে মনে করছেন মানবাধিকারকর্মীরা।
এটি একইসঙ্গে সরকার ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সম্পর্ক পুনর্নির্মাণের এক বাস্তব পদক্ষেপ, যা অতীতের ক্ষতচিহ্নের ওপরে আস্থা ও ন্যায়বিচারের নতুন সেতু গড়ার ইঙ্গিত দেয়।
কানাডার এই সিদ্ধান্ত দেখায় যে, একটি দেশ নিজের ইতিহাসের অন্ধকার দিকের মুখোমুখি হতে ভয় পাচ্ছে না। অচিহ্নিত কবর অনুসন্ধানের প্রকল্পগুলো কেবল মৃত শিশুদের জন্য নয় এগুলো সমগ্র জাতির আত্মসমালোচনা ও মানবিক দায়িত্ববোধের প্রতীক।
ফেডারেল সরকারের এই সিদ্ধান্ত পুনরায় প্রমাণ করল, অতীতের ভুল স্বীকারই ভবিষ্যতের ন্যায়বিচারের প্রথম ধাপ।



