
কানাডার জাতীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কার্যক্রম তদারকি কমিটির (NSICOP) সদস্যদের সংসদীয় দায়মুক্তি সীমিত করে দেওয়া নতুন আইন নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এই আইনকে নিয়েই সুপ্রিম কোর্টে একটি আবেদনের মাধ্যমে তার সাংবিধানিক বৈধতা পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়েছে।
লেকহেড বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক রায়ান আলফোর্ড সুপ্রিম কোর্টে দাখিল করা আবেদনে বলেন, “এই আইন মূলত সংসদ সদস্যদের বাকস্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক বিতর্কের ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ করছে। সংসদীয় দায়মুক্তি যে সুরক্ষা প্রদান করে, এই আইন তা চ্যালেঞ্জ করছে। এটি শুধু আইনগত বিষয় নয়, বরং জনগণের জানার অধিকার ও গণতন্ত্রের মূল কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত।”
অপরদিকে, ফেডারেল সরকারের আইনজীবীরা সুপ্রিম কোর্টে যাওয়া প্রয়োজনীয় নয় বলে যুক্তি দিয়েছেন। তাদের বক্তব্য, বর্তমান আইন কাঠামো যথেষ্ট কার্যকর এবং সংসদীয় দায়মুক্তি নিয়ে নতুনভাবে প্রশ্ন তোলার কোনো প্রয়োজন নেই। তবে শীর্ষ আদালত এই মামলাটি শুনানির জন্য গ্রহণ করবে কি না, তা নিয়ে শিগগিরই রুলিং আসার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
বিতর্কের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স কমিটি অব পার্লামেন্টারিয়ান্স (NSICOP)। এই কমিটিতে এমপি ও সেনেটরদের অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং তারা কানাডার সবচেয়ে গোপনীয় গোয়েন্দা তথ্যের প্রবেশাধিকার পান। গত জুনে প্রকাশিত সরকারি প্রতিবেদনের সংস্করণে বলা হয়, কিছু নির্বাচিত সংসদ সদস্য ইচ্ছাকৃতভাবে অথবা বিভ্রান্তির কারণে বিদেশি রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপমূলক প্রচেষ্টায় সহায়তা করেছেন, যার ফলে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় যে, বিদেশি প্রভাবের সঙ্গে জড়িত ওইসব প্রতিনিধি এখনও সক্রিয় রাজনীতিতে রয়েছেন এবং সংসদীয় কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন।
সাধারণভাবে সংসদ সদস্যরা সংসদীয় দায়মুক্তির কারণে তাদের বক্তব্য বা কর্মকাণ্ডের জন্য আইনি জবাবদিহিতা এড়াতে পারেন। কিন্তু নতুন আইন অনুযায়ী, NSICOP-এর সদস্যদের ক্ষেত্রে এই সুরক্ষা সীমিত করা হয়েছে। যদি তারা গোপন তথ্য ফাঁস করেন বা আইন দ্বারা সুরক্ষিত কোনো নথি প্রকাশ করেন, তবে সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদণ্ডের মুখোমুখি হতে পারেন। এ কারণেই আইনটির সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষয়টি কেবল সংসদীয় দায়মুক্তির সীমার প্রশ্ন নয়; এটি গণতন্ত্রের মূল কাঠামো, জাতীয় নিরাপত্তা ও জনগণের জানার অধিকার সংরক্ষণের সঙ্গে সম্পর্কিত। তারা মনে করেন, বিদেশি প্রভাব, সংসদীয় স্বাধীনতা এবং জাতীয় নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গণমাধ্যম ও গবেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যদি সুপ্রিম কোর্ট এই আইনকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে, তবে সংসদীয় দায়মুক্তির নীতি আরও শক্তিশালী হবে এবং এমপি ও সেনেটররা স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারবে। অন্যদিকে, আইনটি বহাল থাকলে কানাডার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্যরা তাদের কথার জন্য দীর্ঘমেয়াদি শাস্তির ঝুঁকিতে পড়বেন, যা গণতান্ত্রিক চর্চায় এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।
এখন সমস্ত দৃষ্টি সুপ্রিম কোর্টের দিকে। এই রায় শুধুমাত্র গোয়েন্দা কমিটির ভবিষ্যত নির্ধারণ করবে না; বরং পুরো কানাডার সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারা ও সাংবিধানিক ঐতিহ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করবে।



