মানসিক স্বাস্থ্য বাদ দিয়ে স্বেচ্ছামৃত্যু আইন বৈষম্যমূলক: আদালতে চ্যালেঞ্জ

জুমু চৌধুরী

কানাডার স্বেচ্ছামৃত্যু আইন, অর্থাৎ মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স ইন ডাইং, আবারও তীব্র বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে

কানাডার স্বেচ্ছামৃত্যু আইন, অর্থাৎ মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স ইন ডাইং, আবারও তীব্র বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে। অন্টারিও সুপিরিয়র কোর্টে দায়ের হওয়া এক নতুন মামলায় অভিযোগ তোলা হয়েছে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিদের এই আইনের আওতার বাইরে রাখা মূলত বৈষম্যমূলক এবং সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘনের সমান।

এই মামলাটি করেছে মানবাধিকারভিত্তিক সংগঠন Dying With Dignity Canada, সাবেক যুদ্ধ সাংবাদিক জন স্কালি এবং ক্লেয়ার এলিস ব্রোসো। তাদের বক্তব্য, “যারা মানসিক যন্ত্রণায় দিন কাটাচ্ছেন, তাদের জীবনের মান শারীরিক ব্যাধিতে আক্রান্ত কারও চেয়ে কম নয়। তবুও রাষ্ট্র তাদের ‘মরার অধিকার’ কেড়ে নিচ্ছে।”

বর্তমানে কানাডায় মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স ইন ডাইং-এর সুবিধা কেবলমাত্র তাদের জন্য, যারা মরণব্যাধিতে আক্রান্ত বা শারীরিকভাবে এমন অসুস্থ যে জীবনের মান অসহনীয় হয়ে পড়েছে। মানসিক স্বাস্থ্যজনিত ব্যাধি এই তালিকার বাইরে।

কিন্তু মামলার বাদীরা বলছেন, মানসিক যন্ত্রণা যেমন দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্ণতা, ট্রমা-পরবর্তী মানসিক চাপ (PTSD), বা ক্রনিক উদ্বেগ প্রায়ই শারীরিক অসুস্থতার মতোই অসহনীয় কষ্ট সৃষ্টি করে। তাই মানসিক রোগীদের বাদ দেওয়া চার্টার অব রাইটস অ্যান্ড ফ্রিডমস-এর ৭ নম্বর ধারা “জীবন, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার অধিকার” এর সরাসরি লঙ্ঘন।

৮৩ বছর বয়সী জন স্কালি, যিনি অতীতে একজন যুদ্ধ সাংবাদিক ছিলেন, আদালতে বলেছেন দীর্ঘ বছর ধরে তিনি PTSD, হতাশা, উদ্বেগ ও নিদ্রাহীনতায় ভুগছেন।

তার ভাষায়, “গত ৩৬ ঘণ্টায় আমি চার ঘণ্টার বেশি ঘুমাতে পারিনি। প্রতিদিন দুঃস্বপ্ন আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। আমি আর পারছি না, কিন্তু মৃত্যুর সাহায্য চাইতেও পারছি না কারণ আমার ব্যাধি নাকি কেবল ‘মানসিক’।”

স্কালির মতো আরও অনেক কানাডিয়ান একই যন্ত্রণায় দিন কাটাচ্ছেন, যাদের চিকিৎসা, থেরাপি বা ওষুধ কোনোটিই স্থায়ী স্বস্তি এনে দিতে পারছে না।

ফেডারেল সরকার প্রথমে ঘোষণা করেছিল, ২০২৪ সালের মার্চ থেকে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিরাও MAiD-এর জন্য আবেদন করতে পারবেন। কিন্তু মাত্র এক মাস আগে, ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে, সরকার সিদ্ধান্তটি তিন বছর পিছিয়ে দেয় ২০২৭ সালের মার্চ পর্যন্ত।

সরকারের যুক্তি, প্রদেশগুলো এখনো যথেষ্ট প্রস্তুত নয়। মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও এই প্রশ্নে গভীর মতভেদ আছে মানসিক ব্যাধিকে আসলে “আরোগ্য-অসম্ভব” বলে ঘোষণা করা যায় কি না? অনেক সাইকিয়াট্রিস্ট মনে করেন, মানসিক অসুস্থতা প্রায়শই ওঠানামা করে এবং সময়ের সঙ্গে উন্নতি সম্ভব।

মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স ইন ডাইং আইনের ভিত্তি গড়ে ওঠে ২০১৫ সালে Carter v. Canada মামলার রায়ে, যেখানে সুপ্রিম কোর্ট সহায়তাপ্রাপ্ত মৃত্যুকে সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

এরপর ২০১৬ সালে পাস হয় বিল C-14, যা প্রথমবারের মতো মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স ইন ডাইং প্রবর্তন করে। ২০২১ সালে বিল C-7 এর মাধ্যমে আইনটি সংশোধিত হয় এবং দুটি আলাদা প্রক্রিয়া চালু হয় যাদের মৃত্যু “যুক্তিযুক্তভাবে প্রত্যাশিত”, যাদের মৃত্যু তাৎক্ষণিক নয় কিন্তু অসহনীয় যন্ত্রণা চলছে, তবে সেসময় “শুধু মানসিক অসুস্থতা”কে যোগ্যতার বাইরে রাখা হয় অস্থায়ীভাবে, পরবর্তীতে পুনর্বিবেচনার প্রতিশ্রুতিসহ।

বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, কানাডার অধিকাংশ নাগরিক মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স ইন ডাইং-কে নৈতিকভাবে সমর্থন করেন। তবে “শুধু মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা”কে যোগ্যতার মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করার পক্ষে সমর্থন তুলনামূলকভাবে কম প্রায় ৪০–৪৫ শতাংশ।

বিরোধীদের আশঙ্কা, স্বাস্থ্যসেবায় ঘাটতি, দারিদ্র্য বা সামাজিক বিচ্ছিন্নতার কারণে দুর্বল অবস্থায় থাকা মানুষদের হয়তো অযাচিতভাবে “স্বেচ্ছামৃত্যু”র দিকে ঠেলে দেওয়া হতে পারে। অন্যদিকে সমর্থকদের দাবি, এই বাদনীতি বাস্তবে মানসিকভাবে অসুস্থ মানুষদের আরও গভীর যন্ত্রণায় ঠেলে দিচ্ছে, এবং তাদের মানবিক মর্যাদার পরিপন্থী।

এই মামলা এখন শুধু একটি আইনি বিতর্ক নয় এটি মানবিক স্বাধীনতা, নৈতিক দায়িত্ব ও দুর্বল নাগরিকদের সুরক্ষার প্রশ্নে জাতিগত আত্মসমালোচনার সুযোগ এনে দিয়েছে।

একদিকে আছে “স্বায়ত্তশাসনের অধিকার” নিজের কষ্টের সীমা নিজে নির্ধারণ করার স্বাধীনতা; অন্যদিকে আছে “রাষ্ট্রের দায়িত্ব” জীবন রক্ষা ও পুনর্বাসনের সুযোগ দেওয়া।

মানবাধিকার কর্মী জেসন ব্লেয়ার এই প্রতিবেদককে বলছেন, “প্রতি দিন হাজারো মানসিক রোগী নীরবে যন্ত্রণা সহ্য করছেন। চিকিৎসার ব্যর্থতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, আর একাকিত্ব তাদের মৃত্যুকেই মুক্তি মনে করায়। তাদের কণ্ঠকেও শোনা উচিত।”

অন্টারিও সুপিরিয়র কোর্টের এই মামলার রায় শুধু আইন নয়, কানাডার সমাজবোধ ও নৈতিক দর্শনকেও নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করবে। রায় নির্ধারণ করবে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগা কানাডিয়ানরা ভবিষ্যতে কি শারীরিকভাবে অসুস্থদের মতোই “মৃত্যু বেছে নেওয়ার অধিকার” পাবেন, নাকি তাদের প্রতি বৈষম্য বহাল থাকবে। যেভাবেই রায় আসুক, এটি স্পষ্ট কানাডায় জীবনের শেষ অধ্যায় নিয়ে নৈতিক, মানসিক ও মানবিক সংলাপ এখনো শেষ হয়নি।

Related Articles

Back to top button