বৈশ্বিক পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে কানাডায় কর্মী ছাঁটাই করছে জেনারেল মোটরস

আলী আহমেদ

বিশ্বব্যাপী ব্যয় সাশ্রয় ও সাংগঠনিক পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে কানাডায় কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান জেনারেল মোটরস

বিশ্বব্যাপী ব্যয় সাশ্রয় ও সাংগঠনিক পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে কানাডায় কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান জেনারেল মোটরস (জিএম)। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, এবার মূলত সফটওয়্যার ও সার্ভিসেস ইউনিটের বেতনভুক্ত কিছু কর্মীকে বিদায় দেওয়া হবে। ছাঁটাইয়ের আওতায় পড়ছেন কানাডার টেকনিক্যাল সেন্টারের প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদরাও।

যদিও কতজন কর্মীকে ছাঁটাই করা হবে, তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি জিএম। তবে প্রতিষ্ঠানটি নিশ্চিত করেছে, এই সিদ্ধান্ত তাদের বৈশ্বিক কর্মী কমানোর বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ।

জিএম কানাডার যোগাযোগ বিভাগের নির্বাহী পরিচালক জেনিফার রাইট এক বিবৃতিতে জানান, ছাঁটাইয়ের পরও তাদের টেকনিক্যাল সেন্টারে প্রায় ১,২০০ প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদ কাজ চালিয়ে যাবেন। তিনি বলেন, “আমরা ভবিষ্যতের প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে মনোযোগ দিচ্ছি। এজন্য কিছু ক্ষেত্রে কর্মী সংখ্যা কমলেও অন্য ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়ানো হবে।”

টেকনিক্যাল সেন্টারটি মূলত বৈদ্যুতিক গাড়ি (EV), স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা এবং সফটওয়্যার উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ করে থাকে।

২০২৩ সালের এপ্রিলে জিএম ঘোষণা করেছিল যে তারা ২০০ কোটি ডলার ব্যয় সাশ্রয়ের অংশ হিসেবে প্রায় ৫,০০০ কর্মীকে ছাঁটাই করবে। এবারের সিদ্ধান্তে আরও ১,০০০ কর্মীকে বিদায় দেওয়া হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

যদিও কানাডায় এর প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম, অর্থনীতিবিদরা বলছেন এটি দেশের অটোমোবাইল খাতের জন্য এক উদ্বেগজনক ইঙ্গিত।

জিএম মটরস এর একজন কর্মকর্তা এনআরবি টিভিকে বলেন, বৈশ্বিক গাড়ি শিল্প বর্তমানে এক বড় রূপান্তরের পর্যায়ে রয়েছে। বিশ্বজুড়ে কোম্পানিগুলো বৈদ্যুতিক যানবাহন, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ও ডিজিটাল সেবাখাতে বিপুল বিনিয়োগ করছে। এর ফলে প্রচলিত উৎপাদন ইউনিটের কর্মীরা চাকরির ঝুঁকিতে পড়ছেন।

২০২৪ সালে বৈশ্বিক গাড়ি বিক্রির প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ১.৫ শতাংশে। উৎপাদন ব্যয়ের বৃদ্ধি, কাঁচামালের অস্থিরতা এবং সরবরাহ শৃঙ্খল সমস্যা প্রতিষ্ঠানগুলোকে খরচ কমানোর পথে ঠেলে দিচ্ছে।

অন্টারিও প্রদেশ কানাডার অটোমোবাইল শিল্পের কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৪ লাখ মানুষ কর্মরত। ওশাওয়া, মার্কহাম ও উইন্ডসর অঞ্চলে জিএমের কার্যক্রম স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে শ্রমিক ইউনিয়নগুলো। তাদের দাবি, “যেখানে কোম্পানির মুনাফা রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে, সেখানে কর্মী ছাঁটাই অমানবিক। ভবিষ্যতের প্রযুক্তির নামে কর্মসংস্থান ধ্বংস করা হচ্ছে।”

জেনারেল মোটরস জানিয়েছে, আগামী পাঁচ বছরে ৩৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হবে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি প্রযুক্তি, স্বয়ংক্রিয় ড্রাইভিং সফটওয়্যার ও ডিজিটাল সেবা উন্নয়নে। প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য  ২০৩৫ সালের মধ্যে শূন্য-নিঃসরণ গাড়ি উৎপাদন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তন যদিও ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক, কিন্তু বর্তমানে এটি বহু কর্মীর জীবনে তাৎক্ষণিক অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।

অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, অটোমোবাইল খাতে এই রূপান্তর অবশ্যম্ভাবী, কিন্তু এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে কর্মসংস্থানের বিকল্প সুযোগ সৃষ্টি করা এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশেষজ্ঞ রবার্ট হেন্ডারসন, কানাডিয়ান অটোমোবাইল ইনস্টিটিউটের অর্থনীতিবিদ, বলেন “প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে মানবসম্পদ উন্নয়ন না ঘটলে এই রূপান্তর সামাজিক সংকট ডেকে আনবে। সরকার ও বেসরকারি খাতকে একসঙ্গে কাজ করে প্রশিক্ষণ ও পুনঃনিয়োগের ব্যবস্থা নিতে হবে।”

জেনারেল মোটরসের কানাডায় কর্মী ছাঁটাই শুধু একটি কর্পোরেট সিদ্ধান্ত নয় এটি বিশ্ব গাড়ি শিল্পের পরিবর্তনশীল বাস্তবতার প্রতিফলন। কোম্পানি ভবিষ্যতের প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে নিজেকে পুনর্গঠনের পথে নিচ্ছে, কিন্তু এর মূল্য দিতে হচ্ছে অসংখ্য কর্মীকে, যারা আজ অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে আছেন।

Related Articles

Back to top button