
প্রযুক্তি জায়ান্ট গুগল অবশেষে কানাডায় বিজ্ঞাপন ফির ওপর আরোপিত ২.৫ শতাংশ অতিরিক্ত সারচার্জ বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে। এক বছর আগে অটোয়া সরকারের পরিকল্পিত ডিজিটাল সার্ভিসেস ট্যাক্স-এর প্রতিক্রিয়ায় এই মাশুল চালু করেছিল প্রতিষ্ঠানটি। এবার সরকার যখন আনুষ্ঠানিকভাবে সেই আইন প্রত্যাহার করল, গুগল জানাল শুধু সারচার্জ বন্ধই নয় আগে সংগৃহীত অর্থও বিজ্ঞাপনদাতাদের ফেরত দেওয়া হবে।
২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া সারচার্জ বিজ্ঞাপন বাজারে তুমুল আলোড়ন তুলেছিল। কানাডায় প্রদর্শিত প্রতিটি বিজ্ঞাপন তখন স্বাভাবিক খরচের চেয়ে বেশি দামে কিনতে হতো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে। গুগল তখন যুক্তি দিয়েছিল, সরকারের নতুন ডিজিটাল সার্ভিসেস ট্যাক্সের বোঝা তারা একা বহন করতে পারবে না; তাই বিজ্ঞাপনদাতাদের ওপরই এর চাপ পড়বে।
ডিজিটাল সার্ভিসেস ট্যাক্সের আওতায় অনলাইন মার্কেটপ্লেস, বিজ্ঞাপন পরিষেবা এবং ব্যবহারকারীর ডেটা বিক্রির মাধ্যমে আয় করা বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর ৩ শতাংশ কর আরোপের পরিকল্পনা ছিল। কানাডা সরকার ধারণা করেছিল, শুধু প্রথম বছরেই গুগল, অ্যামাজন, উবারসহ মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে প্রায় ২০০ কোটি মার্কিন ডলার রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে।
তবে বাস্তবে পরিস্থিতি অন্যদিকে মোড় নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই করকে কঠোরভাবে চ্যালেঞ্জ করেন। তিনি এটিকে মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক পদক্ষেপ বলে দাবি করে কানাডার সঙ্গে চলমান দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য আলোচনা স্থগিত করে দেন। ফলস্বরূপ, অটোয়া সরকারের ওপর চাপ বাড়তে থাকে। অবশেষে ২০২৫ সালের জুনে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সরকার আইনটি বাতিল করার ঘোষণা দেয়।
সরকারের বক্তব্য ছিল, ডিজিটাল সার্ভিসেস ট্যাক্স কার্যকর হলে কানাডার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্ক মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারত। বৈশ্বিক অর্থনীতির টানাপোড়েনের মাঝে এককভাবে এমন কর আদায় দেশের স্বার্থে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারত।
গুগলের মুখপাত্র এক বিবৃতিতে বলেন, “আমরা কানাডার বিজ্ঞাপনদাতাদের ওপর বাড়তি বোঝা চাপাতে চাই না। সরকার কর আইন বাতিল করায় আমরা সারচার্জ তুলে নিচ্ছি এবং সংগৃহীত অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করছি।”
এই ঘোষণা বিজ্ঞাপন শিল্পে স্বস্তি নিয়ে এসেছে। গত এক বছরে ছোট ব্যবসা ও স্থানীয় মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বিজ্ঞাপন খরচ বেড়ে যাওয়ায় তাদের প্রতিযোগিতা করার ক্ষমতা কমে গিয়েছিল। অর্থনীতিবিদদের মতে, সারচার্জ বাতিল হওয়ায় আবারও বিজ্ঞাপন খাতে স্বাভাবিক প্রতিযোগিতা ফিরবে এবং বাজারে একধরনের স্থিতিশীলতা আসবে।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ শুধুমাত্র অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এর গভীরে রয়েছে আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রভাব। বড় প্রযুক্তি কোম্পানির ওপর কর আরোপের পদক্ষেপ কেবল রাজস্ব বাড়ানোর উপায় নয়, বরং তা বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যকেও প্রভাবিত করে। কানাডার অভিজ্ঞতা ইঙ্গিত দিচ্ছে, ভবিষ্যতে কোনো দেশ বড় টেক কোম্পানিগুলোর ওপর কর আরোপের সিদ্ধান্ত নিলে আগে থেকেই কূটনৈতিক চাপ মোকাবিলার প্রস্তুতি নিতে হবে।
যদিও আপাতত বিজ্ঞাপন শিল্পে স্বস্তি ফিরেছে, দীর্ঘমেয়াদে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে ন্যায়সংগত কর আদায় কীভাবে নিশ্চিত করা হবে? এবং সেই আয় রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কীভাবে সুষমভাবে বণ্টন করা হবে?
বিশ্বজুড়ে এখন অনেক দেশ একই ধরনের কর আরোপের চিন্তাভাবনা করছে। কানাডার অভিজ্ঞতা হয়তো তাদের জন্য সতর্কবার্তা হয়ে থাকবে প্রযুক্তি অর্থনীতি আর বৈশ্বিক রাজনীতির টানাপোড়েনকে আলাদা করে দেখা যায় না।



