অন্টারিও স্কুলে খাওয়ার পানিতে সিসার উপস্থিতি

আশিকুর রহমান

গত মাসে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা ও জবাবদিহির অভাবের কারণে অন্টারিও সরকার এই তিনটি স্কুল বোর্ডের নিয়ন্ত্রণ হাতে নেয়।

অন্টারিওর তিনটি বৃহত্তম স্কুল বোর্ডের পানীয় জলে বিপজ্জনক মাত্রায় সিসা শনাক্ত হওয়ায় শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে কানাডিয়ান এনভায়রনমেন্টাল ল অ্যাসোসিয়েশন (CELA)। সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক থেরেসা ম্যাকক্লেনাঘান এবং কমিউনিটি আউটরিচ কর্মী জুলি মাটিস ৪ জুলাই প্রাদেশিক শিক্ষামন্ত্রী পল ক্যালান্দ্রাকে চিঠি লিখে এ দাবি জানান।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, অটোয়া-কার্লটন ডিস্ট্রিক্ট স্কুল বোর্ড, ডাফেরিন-পিল ক্যাথলিক ডিস্ট্রিক্ট স্কুল বোর্ড এবং টরন্টো ডিস্ট্রিক্ট স্কুল বোর্ড এই তিনটি বোর্ডের বিভিন্ন স্কুল থেকে নেওয়া পানির নমুনায় ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে সর্বোচ্চ মাত্রার সিসা ধরা পড়েছে। এ ঘটনায় শিক্ষার্থীদের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

গত মাসে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা ও জবাবদিহির অভাবের কারণে অন্টারিও সরকার এই তিনটি স্কুল বোর্ডের নিয়ন্ত্রণ হাতে নেয়। এর ফলে সরাসরি প্রাদেশিক সরকারের ওপরই এখন শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পানীয় জল নিশ্চিত করার দায়িত্ব বর্তেছে। জুলি মাটিস এক সাক্ষাৎকারে বলেন,

“যেহেতু সরকার সরাসরি এই স্কুলগুলো পরিচালনা করছে, তাই শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য রক্ষায় দায়ভারও তাদের কাঁধে এসেছে। যদি স্বচ্ছ ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে হাজার হাজার শিক্ষার্থী দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে পড়বে।”

এই সঙ্কট নতুন নয়। গত বছর ইনভেস্টিগেশন জার্নালিজম ব্যুরো (IJB)-এর এক অনুসন্ধানে দেখা যায়, অন্টারিওর সরকারি স্কুলগুলোর অর্ধেকেরও বেশি অন্তত একবার প্রতি পাঁচ বছরে পানীয় জলে সিসার মাত্রা ফেডারেল মানদণ্ড ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ সমস্যাটি বিচ্ছিন্ন নয়, বরং প্রদেশজুড়ে দীর্ঘদিন ধরে চলমান।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিসা একটি মারাত্মক নিউরোটক্সিন। শিশুদের দেহে এটি দ্রুত শোষিত হয় প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় প্রায় চারগুণ বেশি। এর ফলে বুদ্ধি ও মেধা বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়, মনোযোগ কমে যায়, শেখার ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং নানা আচরণগত সমস্যা দেখা দেয়। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব অটিজম-সদৃশ জটিলতা থেকে প্রজন্মান্তরে স্বাস্থ্য সঙ্কটে রূপ নিতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বহু আগেই জানিয়েছে, সিসার এমন কোনো মাত্রা নেই যা নিরাপদ বলে ধরা যায়।

অন্টারিওর হাজারো স্কুল ভবন কয়েক দশক আগে নির্মিত। অনেক ভবনে এখনো পুরোনো সিসার পাইপ বা ফিটিংস ব্যবহৃত হচ্ছে। ফেডারেল ও প্রাদেশিক সরকার নিয়মিত পরীক্ষা চালানোর নির্দেশ দিলেও বাস্তবে সেসব পাইপ প্রতিস্থাপনের কাজ এগোয়নি। ফলে শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

CELA-এর আইনজীবীরা শুধু পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার ওপর নির্ভর না করে অবিলম্বে একটি বাস্তবায়নযোগ্য কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে পুরোনো অবকাঠামো দ্রুত প্রতিস্থাপন, নিয়মিত ও দ্রুত পানির পরীক্ষা, পরীক্ষার ফলাফল অভিভাবক ও জনসাধারণের সামনে প্রকাশ।

তাদের মতে, পদক্ষেপ না নিলে সমস্যা আরও ভয়াবহ হবে এবং কানাডার মতো উন্নত দেশেও শিক্ষার্থীরা অনিরাপদ পরিবেশে শিক্ষা গ্রহণ করতে বাধ্য হবে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এখনই যদি প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ও নীতি পরিবর্তন না করা হয়, তবে ভবিষ্যতে সিসা-দূষিত পানির কারণে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাবে। শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা কেবল নৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং এটি প্রদেশের আর্থসামাজিক ভবিষ্যতের জন্যও অপরিহার্য।

অন্টারিও সরকার এখন এই সংকট কীভাবে মোকাবিলা করে, তার ওপর নির্ভর করছে প্রদেশের হাজার হাজার শিক্ষার্থীর স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ।

Related Articles

Back to top button