দাবানলের উচ্চ ঝুঁকি আগস্টজুড়ে, ইতিমধ্যেই পুড়েছে ৫৫ লাখ হেক্টর বনভূমি

মাহবুবুল আলম

কানাডা বর্তমানে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ দাবানল মৌসুমের মুখোমুখি।

কানাডা বর্তমানে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ দাবানল মৌসুমের মুখোমুখি। ফেডারেল কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে, চলতি বছরের দাবানল পরিস্থিতি আগস্ট মাসে আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে। সরকারি তথ্যে দেখা গেছে, এ বছর এখন পর্যন্ত প্রায় ৫৫ লাখ হেক্টর বনভূমি দাবানলে ভস্মীভূত হয়েছে যা গত ১০ বছরের জুলাইয়ের গড় ক্ষতির প্রায় দ্বিগুণ।

যদিও এই ক্ষয়ক্ষতি ২০২৩ সালের রেকর্ড ভাঙতে পারেনি, তবুও বর্তমান পরিস্থিতি মারাত্মক। ওই বছর প্রায় ৬ হাজার দাবানল কানাডার দেড় কোটি হেক্টর বনাঞ্চল ধ্বংস করেছিল, যা দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড হিসেবে নথিভুক্ত।

শুক্রবার পর্যন্ত সারা দেশে ৫৬১টি দাবানলের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে অন্তত ৬৯টি আগুন নিয়ন্ত্রণের বাইরে। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, সাধারণত কানাডায় আগস্টেই দাবানলের ঝুঁকি সর্বাধিক থাকে। এ বছরও আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলছে, আগস্টজুড়ে তাপমাত্রা থাকবে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি এবং বৃষ্টিপাত হবে কম। ফলে প্রেইরি অঞ্চল, ব্রিটিশ কলাম্বিয়া এবং মেরিটাইম প্রদেশগুলোতে অগ্নিঝুঁকি আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কানাডিয়ান মেটিওরোলজিক্যাল সেন্টারের পরিচালক সেবাস্তিয়ান চুইনার্ড জানিয়েছেন এ পরিস্থিতি বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত পূর্বাভাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাঁর মতে, আগামী পাঁচ বছর তুলনামূলক উষ্ণ হবে, যা কানাডার বনাঞ্চলে খরা ও উচ্চ তাপমাত্রাকে দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতায় রূপ দেবে। এর ফলে দাবানলের জন্য অনুকূল পরিবেশ আরও ঘন ঘন তৈরি হবে।

দাবানলে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে সাস্কেচুয়ান প্রদেশে। স্থানীয় প্রশাসনের মতে, প্রদেশটির ইতিহাসে এত মারাত্মক দাবানল মৌসুম আগে দেখা যায়নি। হাজার হাজার মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। ধ্বংস হয়েছে ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, এমনকি বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে পরিবেশ, অর্থনীতি এবং মানুষের জীবিকার ওপর।

দেশীয় ফায়ারফাইটারদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও পাওয়া যাচ্ছে। ইতোমধ্যেই অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, কোস্টারিকা, মেক্সিকো এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৫৩০ জনের বেশি দমকলকর্মী কানাডায় এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করছেন। তবে দেশজুড়ে একসঙ্গে ছড়িয়ে থাকা শত শত দাবানল সামলানো এখনো দমকল বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দাবানল কেবল বনাঞ্চল ধ্বংস করছে না, বরং বাড়িয়ে তুলছে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকিও। আগুন থেকে নির্গত ঘন ধোঁয়া ইতোমধ্যে কয়েকটি প্রদেশে বায়ুর মানকে বিপজ্জনক স্তরে নামিয়ে এনেছে। দীর্ঘমেয়াদে এই দূষণ শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগসহ নানা স্বাস্থ্য জটিলতা বাড়াবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে কৃষিজমি ও অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কা খাবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধ্বংসযজ্ঞের প্রভাব আগামী কয়েক বছর ধরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, খাদ্য উৎপাদন এবং পরিবেশগত স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলবে।

ফেডারেল ও প্রাদেশিক কর্তৃপক্ষ জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনকে জরুরি প্রস্তুতি জোরদার করতে বলা হয়েছে। পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে বলে বিশেষ সতর্কবার্তা জারি রয়েছে আগস্ট মাসের জন্য।

কানাডার ২০২৫ সালের দাবানল মৌসুম এখনো শেষ হয়নি, অথচ ইতোমধ্যেই এটি দেশটির ইতিহাসের অন্যতম ধ্বংসাত্মক মৌসুম হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। যদি তাপমাত্রা ও খরা পরিস্থিতি এভাবেই চলতে থাকে, তবে বছরের বাকি সময়টি কানাডার জন্য এক কঠিন পরিবেশগত, মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকট বয়ে আনতে পারে।

Related Articles

Back to top button