দুটি কোম্পানিতে ভাগ হচ্ছে ক্রাফট হেইঞ্জ

লিয়াকত আলী

ক্রাফট হেইঞ্জ জানিয়েছে, কোম্পানিটি এখন থেকে দুটি আলাদা ব্যবসা সত্তায় কার্যক্রম চালাবে।

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ খাদ্যপণ্য প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ক্রাফট হেইঞ্জ অবশেষে ঘোষণা দিয়েছে তাদের বহুল আলোচিত সিদ্ধান্ত কোম্পানিটি দুই ভাগে বিভক্ত হতে যাচ্ছে। দুই দশক আগে একীভবনের মাধ্যমে যে ব্র্যান্ডটি খাদ্যশিল্পে নতুন যুগের সূচনা করেছিল, এবার সেই প্রতিষ্ঠানই নিজেদের পুনর্গঠনের পথে হাঁটছে।

ক্রাফট হেইঞ্জ জানিয়েছে, কোম্পানিটি এখন থেকে দুটি আলাদা ব্যবসা সত্তায় কার্যক্রম চালাবে। প্রথম প্রতিষ্ঠানটির নাম আপাতত গ্লোবাল টেস্ট এলিভেশন কোম্পানি (Global Taste Elevation Company), যেখানে থাকবে তাদের জনপ্রিয় ও আন্তর্জাতিক বাজারকেন্দ্রিক ব্র্যান্ডগুলো  শেফ টেবিল মিল, হেইঞ্জ, ফিলাডেলফিয়া ক্রিম চিজ এবং ক্রাফট ম্যাক অ্যান্ড চিজ।

অন্যদিকে দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠানটি পরিচিত হবে নর্থ আমেরিকান গ্রোসারি কোম্পানি (North American Grocery Company) নামে, যার অধীনে থাকবে অস্কার মেয়ার, ক্রাফট সিঙ্গেলস ও লাঞ্চেবলস এর মতো দৈনন্দিন ব্যবহারের ব্র্যান্ড। তবে কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই দুই প্রতিষ্ঠানের চূড়ান্ত ও আনুষ্ঠানিক নাম পরবর্তীতে ঘোষণা করা হবে।

ক্রাফট হেইঞ্জ গত মে মাসেই জানিয়েছিল যে, তারা পুরো কোম্পানির কৌশলগত পর্যালোচনা করছে। সেই সময় থেকেই কোম্পানির বিভক্তির সম্ভাবনা নিয়ে বাজারে গুঞ্জন শুরু হয়। অবশেষে, অক্টোবরের এই ঘোষণা সেই ইঙ্গিতকেই বাস্তবে রূপ দিল।

কোম্পানির নির্বাহী চেয়ারম্যান মিগুয়েল প্যাট্রিসিও এক বিবৃতিতে বলেন, “ক্রাফট হেইঞ্জের ব্র্যান্ডগুলো নিঃসন্দেহে আইকনিক। তবে কোম্পানির বর্তমান কাঠামো এতটাই জটিল যে, কার্যকরভাবে পুঁজি বরাদ্দ, উদ্যোগের অগ্রাধিকার নির্ধারণ ও প্রতিশ্রুতিশীল অঞ্চলে কার্যক্রম বৃদ্ধি করা কঠিন হয়ে পড়ছে।” তিনি আরও যোগ করেন, এই বিভক্তির মাধ্যমে উভয় প্রতিষ্ঠানই তাদের নিজ নিজ ব্যবসায়িক দিক ও বাজার কৌশলে আরও মনোনিবেশ করতে পারবে, যা দীর্ঘমেয়াদে কোম্পানির জন্য ইতিবাচক হবে।

ক্রাফট ও হেইঞ্জের একীভবনের গল্প শুরু হয় ২০১৩ সালে। সে সময় বিলিয়নেয়ার বিনিয়োগকারী ওয়ারেন বাফেট এর নেতৃত্বে এইচ.জে. হেইঞ্জ কোম্পানি ক্রয়ে ব্রাজিলীয় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান থ্রি-জি ক্যাপিটাল (3G Capital) এর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করেন। এই একীভবন চুক্তির পরিমাণ ছিল ২৩ বিলিয়ন ডলার, যা সেই সময় খাদ্যশিল্পের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ চুক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল।

এর মাধ্যমে ক্রাফট ও হেইঞ্জ মিলে এমন একটি প্রতিষ্ঠান গঠন করে, যা যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বজুড়ে খাদ্যপণ্য বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করে।

এই পুনর্গঠনের ফলে কানাডা ও উত্তর আমেরিকার হাজার হাজার কর্মীর চাকরিতে প্রভাব পড়তে পারে এমন আশঙ্কা উঠেছে। কানাডিয়ান গণমাধ্যম গ্লোবাল নিউজ বিষয়টি নিয়ে ক্রাফট হেইঞ্জের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও, প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত কোম্পানির পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, এই বিভক্তি ক্রাফট হেইঞ্জের জন্য দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক হতে পারে, কারণ এতে প্রতিটি ব্র্যান্ড নিজেদের বাজার ও পণ্যের ধরন অনুযায়ী স্বাধীনভাবে পরিচালিত হবে। তবে স্বল্পমেয়াদে প্রশাসনিক পরিবর্তন ও বিনিয়োগ কাঠামোর জটিলতা কিছুটা চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

উল্লেখ্য, হেইঞ্জ কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৬৯ সালে, যুক্তরাষ্ট্রের পিটসবার্গ শহরে। বিগত দেড় শতাব্দী ধরে এটি বিশ্বের অন্যতম বিশ্বস্ত খাদ্যপণ্য ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। অন্যদিকে ক্রাফটের ব্র্যান্ড ঐতিহ্যও কম নয় দুগ্ধজাত পণ্য ও প্যাকেজড খাবারের ক্ষেত্রে এটি দীর্ঘদিন ধরেই উত্তর আমেরিকার পরিবারগুলোর পছন্দের নাম।

ক্রাফট হেইঞ্জের এই নতুন পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে বৈশ্বিক খাদ্যশিল্পে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সময়ই বলবে, এই পুনর্গঠন কোম্পানিটিকে নতুন সাফল্যের দিকে নিয়ে যাবে নাকি একীভবনের স্বপ্ন ভেঙে দিয়ে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি করবে।

Related Articles

Back to top button