আলবার্টার স্কুল লাইব্রেরির বই নিষিদ্ধের সমালোচনা মার্গারেট অ্যাটউডের

আনাস মোহাম্মদ

আলবার্টার শিক্ষা মন্ত্রণালয় জুলাই মাসে নির্দেশ দেয়, ১ অক্টোবরের মধ্যে প্রদেশের সব স্কুল লাইব্রেরি থেকে এমন সব বই সরাতে হবে যাতে “অতিরিক্ত যৌন কনটেন্ট” বা “বিতর্কিত থিম” রয়েছে।

কানাডার বিখ্যাত সাহিত্যিক ও নোবেল মনোনীত লেখিকা মার্গারেট অ্যাটউড সম্প্রতি আলবার্টা প্রদেশের স্কুল লাইব্রেরিগুলো থেকে “অশোভন” বা “যৌন কনটেন্টযুক্ত” বই সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেছেন। এই বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে অ্যাটউডেরই বিশ্ববিখ্যাত উপন্যাস দি হ্যান্ডমেইড’স টেল যা নারীর স্বাধীনতা, দমননীতি ও ধর্মীয় উগ্রতার বিরুদ্ধে এক কালজয়ী প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আলবার্টার শিক্ষা মন্ত্রণালয় জুলাই মাসে নির্দেশ দেয়, ১ অক্টোবরের মধ্যে প্রদেশের সব স্কুল লাইব্রেরি থেকে এমন সব বই সরাতে হবে যাতে “অতিরিক্ত যৌন কনটেন্ট” বা “বিতর্কিত থিম” রয়েছে।

এই নির্দেশের পর এডমন্টন পাবলিক স্কুল বোর্ড ঘোষণা করে যে তারা তাদের লাইব্রেরি থেকে ২০০টিরও বেশি বই সরিয়ে ফেলবে। সরানো বইগুলোর তালিকায় শুধু অ্যাটউডের দি হ্যান্ডমেইড’স টেল নয়, রয়েছে আরও বহু বিশ্ববিখ্যাত সাহিত্যকর্ম। যেমন – মায়া অ্যাঞ্জেলুর I Know Why the Caged Bird Sings, অ্যালডাস হাক্সলির Brave New World এবং অ্যালিস মুনরো ও আয়ন র‌্যান্ডের রচনাও। এই বইগুলো দীর্ঘদিন ধরে স্কুল ও কলেজ পর্যায়ের সাহিত্যের অংশ ছিল। কিন্তু নতুন নিয়মের পর সেগুলো “শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশে ক্ষতিকর” বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এই সিদ্ধান্তে হতবাক অ্যাটউড ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন – “আলবার্টার স্কুলগুলোতে যদি দি হ্যান্ডমেইড’স টেল ‘অনুপযুক্ত’ হয়, তাহলে আমি এখন নতুন এক গল্প লিখেছি জন ও মেরিকে নিয়ে। তারা প্রেমে পড়ে, বিয়ে করে, কিন্তু কোনো যৌন সম্পর্ক না করেই তাদের পাঁচটি নিখুঁত সন্তান জন্মায়। তারা পুঁজিবাদে বিশ্বাসী, গরিবদের প্রতি উদাসীন, এবং সুখে শান্তিতে বসবাস করে… একেবারে নিখুঁত দম্পতি।” অ্যাটউডের এই পোস্টে তিনি স্পষ্ট ব্যঙ্গ করেছেন আলবার্টার “নৈতিক পুলিশি মনোভাব”-এর প্রতি। তিনি লেখেন, “এই দম্পতি মারা যায়নি। তারা একসঙ্গে বেঁচে থাকে কারণ সুখ মানে কোনো প্রশ্ন না করা, কোনো বই না পড়া, এবং কোনো সত্য না দেখা।”

শেষে তিনি ইঙ্গিতপূর্ণভাবে লেখেন, “এভাবেই দি হ্যান্ডমেইড’স টেল বাস্তব হয়ে ওঠে, আর প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথ নিজেকে নতুন এক নীল পোশাকে খুঁজে পান চাকরিহীন এক নারী হিসেবে।” এখানে তিনি সরাসরি আলবার্টার প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথ-এর দিকেই ইঙ্গিত করেছেন, যিনি এই বই সেন্সর নীতির রাজনৈতিক সমর্থক।

সমালোচকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত আসলে “শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা” নয়, বরং সাহিত্যিক স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ। দি হ্যান্ডমেইড’স টেল বা Brave New World—এই বইগুলো সমাজ, ধর্ম, ও ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে গভীর প্রশ্ন তোলে। এসব বই নিষিদ্ধ করার অর্থ এক প্রজন্মকে প্রশ্ন করতে শেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা।

কানাডার সাহিত্য বিশ্লেষক র‍্যাচেল মারে বলেন, “এই নীতি শিক্ষার্থীদের ‘নিরাপত্তা’ নয়, বরং অন্ধ আনুগত্য শেখাবে। ইতিহাসে দেখা গেছে, বই পোড়ানো বা নিষিদ্ধ করার চেষ্টা সবসময়ই সমাজকে পিছিয়ে দিয়েছে।”

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই অ্যাটউডের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এক পাঠক লিখেছেন, “যে সমাজ দি হ্যান্ডমেইড’স টেলকে ভয় পায়, সে সমাজ আসলে সেই উপন্যাসেরই বাস্তব প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠছে।”

অন্যদিকে, কিছু অভিভাবক বলছেন, স্কুল পর্যায়ে যৌনতা বা সহিংসতার মতো বিষয়বস্তুর বই রাখা “অভিভাবকদের অনুমতি ছাড়া ঠিক নয়”। ফলে বিষয়টি কেবল সাহিত্য নয়, বরং সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বিতর্কে রূপ নিয়েছে।

মার্গারেট অ্যাটউডের প্রতিক্রিয়া শুধু রাগ নয়, বরং এক ধরনের সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ। তার ব্যঙ্গের ভেতরে লুকিয়ে আছে গভীর প্রশ্ন যখন একটি সমাজ নিজের সন্তানদের বাস্তবতার মুখোমুখি হতে ভয় পায়, তখন আসলে সে কাকে রক্ষা করছে শিশুকে, নাকি ক্ষমতাকে?

বই সরানোর এই ঘটনা শুধু আলবার্টার শিক্ষা ব্যবস্থায় নয়, পুরো বিশ্বের সাহিত্যপ্রেমীদের জন্য এক সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না; তাকে দমন করার চেষ্টা মানেই আরও বড় বিদ্রোহের জন্ম দেওয়া।

Related Articles

Back to top button