নর্থভোল্ট ব্যাটারি ফ্যাক্টরিতে অর্থায়ন বন্ধ করছে কুইবেক

জামির হোসেন

এই প্রকল্পে কুইবেক সরকার এখন পর্যন্ত প্রায় ৫১ কোটি ডলার ব্যয় করেছে।

কানাডার কুইবেক প্রদেশের মন্টেরেজিয়ে অঞ্চলে নর্থভোল্টের প্রস্তাবিত ব্যাটারি কারখানায় আর সরকারি তহবিল দেওয়া হবে না এমন কড়া সিদ্ধান্তের ঘোষণা দিয়েছে কুইবেক সরকার। প্রদেশের অর্থমন্ত্রী ক্রিস্টিন ফ্রেশেট জানিয়েছেন, “নর্থভোল্ট কোম্পানি কুইবেকবাসীর স্বার্থ রক্ষায় একটি গ্রহণযোগ্য ও টেকসই পরিকল্পনা উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে সরকার এই প্রকল্পে আর অর্থ বিনিয়োগ করবে না।”

এই প্রকল্পে কুইবেক সরকার এখন পর্যন্ত প্রায় ৫১ কোটি ডলার ব্যয় করেছে। মূলত এটি ছিল একটি বৃহৎ সবুজ জ্বালানি উদ্যোগ যার লক্ষ্য ছিল বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি উৎপাদনের মাধ্যমে কুইবেককে উত্তর আমেরিকার ক্লিন এনার্জি শিল্পের কেন্দ্রে পরিণত করা।

কিন্তু পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে যখন নর্থভোল্টের মূল সুইডিশ কোম্পানি মার্চ মাসে আদালতে দেউলিয়াত্বের আবেদন করে। এর ফলে কুইবেক সরকার ২৭ কোটি ডলার বিনিয়োগ থেকে বঞ্চিত হয়। বর্তমানে প্রাদেশিক সরকার ২৪ কোটি ডলারের গ্যারান্টিড ঋণ পুনরুদ্ধারের আশায় রয়েছে, যা মূলত কারখানার জন্য জমি কেনার অর্থ হিসেবে দেওয়া হয়েছিল।

অর্থমন্ত্রী ফ্রেশেট বলেন, “আমরা জনগণের টাকায় এমন কোনো প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে পারি না যা স্বচ্ছতা, স্থায়িত্ব এবং দায়বদ্ধতার মানদণ্ড পূরণ করতে ব্যর্থ।”

এদিকে আমেরিকান কোম্পানি লিটেন (LytEn) গত মাসে ঘোষণা দিয়েছে, তারা নর্থভোল্টের ব্যাটারি প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ নিতে আগ্রহী। লিটেন ইতিমধ্যে ফেডারেল ও প্রাদেশিক সরকার উভয়ের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে বলে জানিয়েছে। কোম্পানিটি মনে করে, প্রকল্পটি সঠিকভাবে পরিচালনা করা গেলে কুইবেকের অর্থনীতি ও সবুজ প্রযুক্তি খাত উভয়ের জন্যই এটি একটি “গেম চেঞ্জার” হতে পারে।

তবে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, নর্থভোল্ট প্রকল্পের ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই অনিশ্চিত। কুইবেকের সরকারের বিনিয়োগ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের ফলে প্রকল্পের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাছাড়া দেউলিয়াত্ব প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত নতুন কোনো কোম্পানি কতটা নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো শুরু থেকেই নর্থভোল্টের পরিকল্পনা নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছিল। তাদের দাবি ছিল, প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব পর্যাপ্তভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। এখন সরকারের এই সিদ্ধান্তে তারা সন্তোষ প্রকাশ করেছে। মন্টেরেজিয়ে অঞ্চলের এক পরিবেশ কর্মী বলেন, “এটি জনগণের জয়ের মুহূর্ত। উন্নয়ন চাই, কিন্তু তা হতে হবে দায়িত্বশীল ও স্বচ্ছভাবে।”

অন্যদিকে স্থানীয় ব্যবসায়ী মহল মনে করছে, সরকারের এই সিদ্ধান্তে এলাকায় সম্ভাব্য কর্মসংস্থানের সুযোগ হ্রাস পেতে পারে। তাদের মতে, প্রকল্পটি যদি নতুন কোনো বিনিয়োগকারীর হাতে পুনরায় শুরু হয়, তাহলে প্রদেশের শিল্পোন্নয়ন আবার গতিশীল হতে পারে।

নর্থভোল্ট প্রকল্পে অর্থায়ন বন্ধের সিদ্ধান্ত কুইবেক সরকারের জন্য যেমন রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, তেমনি এটি দেশের সবুজ অর্থনীতির রূপান্তর প্রক্রিয়ায় একটি বড় ধাক্কা। সরকার এখন স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে প্রকল্প যত বড়ই হোক, যদি তা জনস্বার্থ ও দায়বদ্ধতার মানদণ্ডে ব্যর্থ হয়, তবে সরকারি অর্থ সেখানে বিনিয়োগ করা হবে না।

তবে সবকিছুর পরও এই প্রকল্পের সম্পূর্ণ পতন ঘটেছে বলা যাবে না। লিটেনসহ নতুন বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ দেখায়, কুইবেক এখনও ব্যাটারি উৎপাদন শিল্পে সম্ভাবনাময় কেন্দ্র হিসেবে টিকে আছে। এখন দেখার বিষয়, এই সম্ভাবনা কতটা বাস্তবে রূপ নেয়।

Related Articles

Back to top button