
প্রকৃতি যেন এখন আর শান্ত নেই দাবানল, বন্যা, প্রবল তাপদাহ ও টর্নেডো একের পর এক আঘাতে দেশটি বিপর্যস্ত। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে ভয়াবহ এক চিত্র দেশটির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নাগরিক জানিয়েছেন, গত এক বছরে তারা সরাসরি চরম আবহাওয়ার ক্ষতির শিকার হয়েছেন।
লেজার (Leger) পরিচালিত এই নতুন সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত কানাডার ৩৩ শতাংশ মানুষ এমন দুর্যোগের প্রভাব অনুভব করেছেন। মাত্র এক বছর আগে, ২০২৩ সালে এই হার ছিল ২৫ শতাংশ অর্থাৎ প্রতি চারজনের একজন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৮ শতাংশীয় পয়েন্ট, যা জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
সমীক্ষার আঞ্চলিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, কানাডার কিছু প্রদেশে চরম আবহাওয়ার প্রভাব দ্বিগুণের কাছাকাছি বেড়েছে। ব্রিটিশ কলাম্বিয়া (B.C.): গত বছর যেখানে ২২ শতাংশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন, এ বছর সেই হার বেড়ে হয়েছে ৪৩ শতাংশ প্রায় দ্বিগুণ। কুইবেক: ২৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪১ শতাংশে পৌঁছেছে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের হার। অন্টারিও: এক বছরে ১৩ শতাংশীয় পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৩১ শতাংশে। ম্যানিটোবা ও সাস্কেচুয়ান: তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল, ২১ শতাংশেই অপরিবর্তিত রয়েছে ক্ষতির হার। আটলান্টিক কানাডা: সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র এখানেই এ অঞ্চলের প্রায় অর্ধেক মানুষ জানিয়েছেন, তারা সরাসরি চরম আবহাওয়ার ক্ষতির মুখে পড়েছেন। গত বছর এই হার ছিল এক-তৃতীয়াংশ।
২০২৫ সালের সমীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে এমন এক সময়, যখন জ্যাস্পার ন্যাশনাল পার্কের বিশাল এলাকা দাবানলে ভস্মীভূত, টরন্টোর মতো শহরগুলো বৃষ্টিবহুল গ্রীষ্মে প্লাবিত, আর দেশের নানা প্রান্তে তাপদাহে জনজীবন বিপর্যস্ত। শুধু জুলাই মাসের মাঝামাঝি এক ভয়াবহ রেইনস্টর্মেই বিমাকৃত সম্পদের ক্ষতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০০ কোটি কানাডিয়ান ডলার যা দেশটির ইতিহাসে আবহাওয়াজনিত ক্ষতির আরেকটি নতুন রেকর্ড।
বীমা ব্যুরো অব কানাডার তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে আবহাওয়াজনিত দুর্যোগে বিমা খাতে ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৩.১ বিলিয়ন ডলার, ২০২৩ সালে তা বেড়ে হয় ৩.৫ বিলিয়ন ডলার, আর ২০২৫ সালে অনুমান করা হচ্ছে এই অঙ্ক ৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে।
শুধু দাবানলের কারণেই ধ্বংস হয়েছে প্রায় ১৮ লাখ হেক্টর বনভূমি, আলবার্টা প্রদেশে কৃষিক্ষেত্রে ক্ষতির অঙ্ক দাঁড়িয়েছে ৫০ কোটি ডলার, এবং পর্যটন শিল্পেও ক্ষতির পরিমাণ শত কোটি ডলারের বেশি।
দাবদাহ ও ধোঁয়ার কারণে শ্বাসকষ্ট ও হৃদরোগে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে ১৮ শতাংশ। গবেষকদের মতে, এটি শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নয়, বরং ভবিষ্যতের আরও ভয়াবহ স্বাস্থ্য সংকটের পূর্বাভাস। হাসপাতালগুলোতে বিশেষত বয়স্ক ও শিশু রোগীদের মধ্যে শ্বাসজনিত জটিলতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
যদিও বাস্তবে ক্ষতির পরিসর ক্রমেই বাড়ছে, লেজারের সমীক্ষা বলছে কানাডিয়ানদের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে মতামতে বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। অধিকাংশ নাগরিক এখনও একে “গুরুতর সংকট” বলে মনে করেন। কিন্তু রাজনৈতিক বিভাজন, অর্থনৈতিক স্বার্থ ও নীতিনির্ধারণে ঐক্যের অভাবে জাতীয় পর্যায়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
কানাডিয়ান ক্লাইমেট ইনস্টিটিউট তাদের এক প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলেছে যদি এখনই দৃঢ় পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে আগামী এক দশকে চরম আবহাওয়াজনিত ক্ষতির বার্ষিক অঙ্ক ১০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এটি শুধু অর্থনীতির জন্য নয়, বরং দেশের সামাজিক স্থিতিশীলতা, জনস্বাস্থ্য ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও এক বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
বিশ্বের অন্যতম শীতল দেশ কানাডা এখন উষ্ণতার দহনেই পুড়ছে প্রকৃতির রোষ যে সীমা ছাড়াচ্ছে, তা সংখ্যার পরিসংখ্যানেই পরিষ্কার। বিজ্ঞানীরা বলছেন, যদি এখনই জলবায়ু পরিবর্তন রোধে কার্যকর নীতি গ্রহণ না করা হয়, তবে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কানাডা এক ভয়াবহ পরিবেশ সংকটের মুখে পড়বে, যেখান থেকে ফিরে আসা কঠিন হতে পারে।



