টরন্টোর আবাসন বাজারে স্থবিরতা

মাসুদ করিম

২০২৫ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে গ্রেটার টরন্টো অ্যান্ড হ্যামিল্টন এরিয়ায় (জিটিএইচএ) সক্রিয় প্রকল্পের সংখ্যা ছিল ৪৮১টি

নিয়ন্ত্রণমূলক জটিলতা, উচ্চ সুদের হার এবং আর্থিক অনিশ্চয়তার কারণে টরন্টোর আবাসন খাতে এখন গভীর সংকট দেখা দিয়েছে। শহরটির অসংখ্য আবাসন প্রকল্প অনুমোদন পেলেও নির্মাণ কার্যত থমকে গেছে। নতুন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে স্থবির প্রকল্পের সংখ্যা সক্রিয় প্রকল্পের চেয়ে অনেক বেশি, যা টরন্টোর আবাসন বাজারে অচলাবস্থার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সামাজিক সংগঠন সিভিক অ্যাকশন তাদের অক্টোবর ২০২৫-এর প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গ্রেটার টরন্টো অ্যান্ড হ্যামিল্টন এরিয়া (GTHA)–তে ২০২৫ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে সক্রিয় নির্মাণ প্রকল্পের সংখ্যা ছিল মাত্র ৪৮১টি। বিপরীতে অনুমোদন পাওয়া কিন্তু কাজ শুরু না হওয়া বা স্থবির প্রকল্পের সংখ্যা ২,২২০টি, অর্থাৎ প্রায় চারগুণ বেশি।

এই স্থবির প্রকল্পগুলোতে মোট ১২ লাখ ১৮ হাজার ৬২৬টি আবাসিক ইউনিট নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু আর্থিক সংকট, শ্রমিকের ঘাটতি এবং ঋণের ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় এগুলোর নির্মাণ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।

সিভিক অ্যাকশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লেসলি উড টরন্টোর সিটিভি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “আমরা আবাসন অনুমোদনের ক্ষেত্রে সাফল্য দেখিয়েছি প্রতি বছর হাজার হাজার প্রকল্প অনুমোদিত হচ্ছে। কিন্তু নির্মাণ পর্যায়ে এসে আমরা ভয়াবহভাবে ব্যর্থ হচ্ছি। অনুমোদিত প্রতি ১২টি প্রকল্পের মধ্যে বাস্তবে নির্মাণ শুরু হয়েছে মাত্র একটির।”

উডের মতে, সরকার ও পৌর প্রশাসন দ্রুত অনুমোদন দিলেও প্রকৃত বিনিয়োগের অভাব এবং নির্মাণ ব্যয়ের লাগামহীন বৃদ্ধি প্রকল্পগুলোকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।

সিভিক অ্যাকশন আরও জানিয়েছে, নতুন নির্মিত ভাড়া বাড়িগুলোর মধ্যেও বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। তাদের তথ্যমতে, নতুন ভাড়া দেওয়া ইউনিটগুলোর মাত্র ৫০.৩ শতাংশে ভাড়াটিয়া রয়েছে। বাকি অর্ধেক খালি পড়ে আছে, কারণ ভাড়া মধ্যবিত্ত আয়ের নাগালের বাইরে চলে গেছে।

উডের মতে, “ভাড়ার বাজার এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে মধ্যবিত্ত পরিবারের আয়ের সঙ্গে ভাড়ার কোনো সামঞ্জস্য নেই। ফলে প্রচুর নতুন ইউনিট খালি পড়ে থাকলেও প্রকৃত চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না।”

এর আগে আবাসন বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান আরবানেশন (Urbanation) তাদের প্রতিবেদনে কন্ডো বাজারের ভয়াবহ শ্লথতার ইঙ্গিত দিয়েছিল। সিভিক অ্যাকশনের নতুন তথ্য সেই উদ্বেগকেই আরও জোরালো করেছে।

আরবানেশনের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে জিটিএইচএর নতুন কন্ডো বাজার ৩৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় পড়েছে। চলতি প্রান্তিকেই বাতিল হয়েছে ১০টি প্রকল্পের ২,৪৯৯টি ইউনিট, ফলে চলতি বছরে মোট ১৮টি প্রকল্প (মোট ৪,০৪০ ইউনিট) বাতিল হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংক সুদের হার বৃদ্ধি, নির্মাণ সামগ্রীর দাম বাড়া এবং ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাওয়া এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে মিলেই আবাসন খাতে বর্তমান অচলাবস্থা তৈরি করেছে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, যদি এই স্থবিরতা আরও কিছু ত্রৈমাসিক অব্যাহত থাকে, তবে এটি শুধু রিয়েল এস্টেট নয়, গোটা টরন্টোর অর্থনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলবে। নির্মাণ খাতের কর্মসংস্থান কমে যেতে পারে, আর একই সঙ্গে শহরের দীর্ঘমেয়াদি আবাসন সংকট আরও গভীর হবে।

সব মিলিয়ে, টরন্টোর আবাসন বাজার বর্তমানে এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে অনুমোদিত প্রকল্পের সংখ্যা বেড়েই চলেছে, কিন্তু ক্রেন আর কংক্রিটের শব্দ থেমে গেছে শহরের আকাশে।

This article was written by Masud Karim as part of the LJI

Related Articles

Back to top button