
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নতুন জাতীয় বিদ্যুৎ কৌশল প্রকাশ করেছেন। বৃহস্পতিবার ঘোষিত এই পরিকল্পনা শুধু কানাডার জ্বালানি খাতের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনাই নয়, বরং দেশটির জলবায়ু নীতি ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যকার নতুন ভারসাম্যকেও সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রাকৃতিক গ্যাসের ভূমিকা বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে সরকার ধীরে ধীরে ২০৩০ সালের প্যারিস জলবায়ু প্রতিশ্রুতি থেকে কিছুটা সরে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
নতুন পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে কানাডার জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড প্রায় দ্বিগুণ করা হবে। বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বৃদ্ধি, শিল্পায়নের সম্প্রসারণ, ডেটা সেন্টার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তির বিস্তার এবং ঘরোয়া বিদ্যুতায়নের কারণে আগামী কয়েক দশকে বিদ্যুতের চাহিদা ব্যাপক হারে বাড়বে বলে ধারণা করছে সরকার।
এই বাড়তি চাহিদা পূরণে নবায়নযোগ্য জ্বালানির পাশাপাশি প্রাকৃতিক গ্যাসকে একটি “বাস্তবসম্মত সহায়ক শক্তি” হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সরকার জানিয়েছে, বর্তমান পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ নীতিমালার কিছু কঠোর ব্যাখ্যার কারণে গ্যাসভিত্তিক নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ কঠিন হয়ে পড়েছিল। তাই নিয়মে কিছু পরিবর্তন আনা হবে যাতে প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র স্থাপন করা যায়।
পার্লামেন্ট হিলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী কার্নি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, বিদ্যুতের ভবিষ্যৎ নিয়ে সরকার কেবল আদর্শিক অবস্থানে থাকতে চায় না; বরং সাধারণ মানুষের ব্যয় ও সরবরাহ নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে চায়। তিনি বলেন, বিশ্বের অন্যতম সস্তা প্রাকৃতিক গ্যাস কানাডায় পাওয়া যায় এবং এই সুবিধা কাজে লাগানো প্রয়োজন। তার ভাষায়, “যদি আমরা ভুল সিদ্ধান্ত নিই, তাহলে কানাডিয়ানদের অনেক বেশি বিদ্যুৎ বিল দিতে হবে। আর যদি অতিরিক্ত সতর্ক হই, তাহলে বিদ্যুতের ঘাটতি তৈরি হতে পারে।” কার্নি আরও বলেন, কেবল নিষেধাজ্ঞা ও কঠোর পরিবেশনীতি দিয়ে বাস্তব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে এমন একটি বিদ্যুৎ ব্যবস্থা তৈরি করা, যা একই সঙ্গে নির্ভরযোগ্য, সাশ্রয়ী এবং তুলনামূলকভাবে পরিচ্ছন্ন হবে।
সরকারি নথিতে বলা হয়েছে, বায়ু ও সৌরবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য শক্তি নিরবচ্ছিন্ন নয়। আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় কখনও বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যায়। ঠিক সেই সময় দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়াতে পারে প্রাকৃতিক গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো। নবায়নযোগ্য শক্তির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে “ব্যাকআপ পাওয়ার” হিসেবে গ্যাসের ব্যবহার বাড়ানোর প্রবণতা বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই দেখা যাচ্ছে। কানাডাও এখন সেই পথেই এগোচ্ছে। তবে সমালোচকদের আশঙ্কা, এই নীতির ফলে দীর্ঘমেয়াদে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা আরও শক্তিশালী হতে পারে। কারণ একবার বড় গ্যাস অবকাঠামো তৈরি হলে তা কয়েক দশক ধরে ব্যবহার চালিয়ে যাওয়ার চাপ তৈরি হয়।
কার্নি দাবি করেছেন, নতুন বিদ্যুৎ কৌশলের মাধ্যমে ২০৫০ সালের মধ্যে বছরে ২৫ থেকে ৩০ কোটি টন কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব হবে। তার মতে, এই হ্রাস আসবে পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্প্রসারণের মাধ্যমে। কিন্তু এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কানাডার বর্তমান জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে অন্তত ২২ কোটি ৭০ লাখ টন কার্বন নিঃসরণ কমাতে হবে। পরিবেশবাদীরা বলছেন, যদি সরকার একই সঙ্গে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাড়ায়, তাহলে স্বল্পমেয়াদে সেই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে প্যারিস জলবায়ু প্রতিশ্রুতির অধীনে কানাডা যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা পূরণে আরও কঠোর নীতি প্রয়োজন বলে মনে করেন অনেকে। তাদের মতে, সরকার “পরিচ্ছন্ন জ্বালানি রূপান্তর” এর বদলে এখন “জ্বালানি নিরাপত্তা” ও “অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা”কে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
সরকার বলছে, নতুন কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো বিদ্যুতের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রায় ৭০ শতাংশ কানাডিয়ান পরিবারের জ্বালানি ব্যয় কম রাখার চেষ্টা করা হবে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময় সাধারণ মানুষের কাছে বিদ্যুতের সাশ্রয়ী মূল্য একটি বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে। ফলে কার্নি সরকার জলবায়ু নীতির পাশাপাশি ভোটারদের আর্থিক চাপের বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে।
এই কৌশল কানাডার রাজনীতিতেও নতুন বিতর্ক তৈরি করতে পারে। পরিবেশবাদী দল ও জলবায়ু আন্দোলনকারীরা সরকারের অবস্থানকে “পিছিয়ে যাওয়া” হিসেবে দেখতে পারেন। অন্যদিকে শিল্পখাত ও কিছু প্রাদেশিক সরকার এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে, কারণ তারা দীর্ঘদিন ধরে আরও নমনীয় জ্বালানি নীতির দাবি জানিয়ে আসছিল। আন্তর্জাতিকভাবেও এই সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কানাডা দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে জলবায়ু নেতৃত্বের একটি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছিল। এখন যদি দেশটি প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার বাড়ানোর পথে এগোয়, তাহলে অন্যান্য উন্নত দেশও একই ধরনের যুক্তি সামনে আনতে পারে।
মার্ক কার্নির নতুন বিদ্যুৎ কৌশল মূলত একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্যের প্রচেষ্টা। একদিকে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার আন্তর্জাতিক চাপ, অন্যদিকে রয়েছে সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তার বাস্তব চাহিদা। এই পরিকল্পনা হয়তো স্বল্পমেয়াদে বিদ্যুৎ সরবরাহ ও মূল্য নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি কানাডার পরিবেশগত অঙ্গীকারকে কতটা প্রভাবিত করবে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।



