বৈশ্বিক অর্থনীতি নিয়ে কানাডিয়ান সিইওরা কম আত্মবিশ্বাসী

জামির হোসেন

সাম্প্রতিক এই বৈশ্বিক সমীক্ষায় বিশ্বজুড়ে সিইওদের মতামত বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

বৈশ্বিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে কানাডার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের (সিইও) আত্মবিশ্বাস ক্রমশ কমে আসছে। নতুন একটি বৈশ্বিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, চলতি বছরে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি হবে এমন প্রত্যাশা কানাডিয়ান সিইওদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল। বিপরীতে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সিইওরা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি আশাবাদী অবস্থানে রয়েছেন।

সাম্প্রতিক এই বৈশ্বিক সমীক্ষায় বিশ্বজুড়ে সিইওদের মতামত বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ফলাফলে দেখা যায়, বৈশ্বিকভাবে ৬১ শতাংশ সিইও আগামী ১২ মাসে উন্নত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির আশা করছেন। এটি গত বছরের সমীক্ষার তুলনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি তখন এই হার ছিল ৫৮ শতাংশ। তবে কানাডার ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ১৩৩ জন কানাডিয়ান সিইওর মধ্যে মাত্র ৪৭ শতাংশ মনে করছেন, চলতি বছরে অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হবে।

কেবল বৈশ্বিক অর্থনীতি নয়, দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও কানাডিয়ান সিইওদের আস্থায় বড় ধরনের চিড় ধরেছে। চলতি বছরে মাত্র ২৭ শতাংশ কানাডিয়ান সিইও অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির উন্নতির প্রত্যাশা করছেন। অথচ গত বছর একই প্রশ্নে আশাবাদী ছিলেন ৪২ শতাংশ সিইও। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি নিয়ে আশাবাদের হার ১৫ শতাংশ পয়েন্ট কমে গেছে।

পিডব্লিউসি কানাডার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিকোলাস মারু এই পরিস্থিতিকে কানাডিয়ান ব্যবসায়ী নেতাদের জন্য “গুরুত্বপূর্ণ এক সন্ধিক্ষণ” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর মতে, পাঁচ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে এই প্রথম কানাডিয়ান সিইওদের মনোভাব বৈশ্বিক আশাবাদের প্রবণতার বিপরীত দিকে যাচ্ছে, যা দেশটির অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতি ও শুল্ক কাঠামো নিয়ে কানাডিয়ান সিইওরা বৈশ্বিক সহকর্মীদের তুলনায় অনেক বেশি উদ্বিগ্ন। সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ৫৩ শতাংশ কানাডিয়ান সিইও এসব নীতিগত অনিশ্চয়তাকে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে সীমান্ত বাণিজ্য, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং রপ্তানি নির্ভর খাতগুলোর ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।

এর পাশাপাশি, ভবিষ্যৎ মুনাফা নিয়েও সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন অনেকেই। প্রায় ৩৫ শতাংশ কানাডিয়ান সিইও আগামী বছরে মুনাফার হার কমে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, যা বিনিয়োগ ও সম্প্রসারণ পরিকল্পনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রতিবেদনে প্রযুক্তিগত দিক থেকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতার কথা উঠে এসেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) গ্রহণের ক্ষেত্রে কানাডা এখনও বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় পিছিয়ে। যদিও ৯৪ শতাংশ কানাডিয়ান ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কোনো না কোনো মাত্রায় এআই ব্যবহার করছে, তবে পুরো প্রতিষ্ঠানজুড়ে সমন্বিতভাবে এআই প্রয়োগ করছে মাত্র ২৯ শতাংশ কোম্পানি। বৈশ্বিকভাবে এই হার ৪৩ শতাংশ।

আরও উদ্বেগজনক হলো, সুনির্দিষ্ট এআই কৌশল বা পথরেখা (রোডম্যাপ) রয়েছে মাত্র ৩৭ শতাংশ কানাডিয়ান প্রতিষ্ঠানের। বিশ্বব্যাপী যেখানে ৫১ শতাংশ কোম্পানি ইতোমধ্যে স্পষ্ট এআই কৌশল গ্রহণ করেছে, সেখানে কানাডার এই পিছিয়ে থাকা ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতায় প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকদের মত।

সব মিলিয়ে প্রতিবেদনের বিশ্লেষণে স্পষ্ট, বৈশ্বিক অর্থনীতি নিয়ে যখন আন্তর্জাতিক সিইওদের মধ্যে ধীরে ধীরে আশাবাদ ফিরছে, তখন কানাডিয়ান ব্যবসায়ী নেতারা তুলনামূলকভাবে বেশি সতর্ক ও উদ্বিগ্ন অবস্থানে রয়েছেন। অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং প্রযুক্তিগত রূপান্তরে ধীরগতি এই তিনটি বিষয়ই কানাডার কর্পোরেট আস্থাকে চাপে ফেলছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, নীতিগত স্থিতিশীলতা ও প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ বাড়ানো না গেলে এই আস্থার সংকট আরও গভীর হতে পারে।

Related Articles

Back to top button