মৃত ঘোষণার অর্ধশতক পর ডন নদীতে প্রাণের প্রত্যাবর্তন ফিরছে মাছ পাখি আর জীবনের ছন্দ

মাসুদ করিম

প্রায় ৩৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ডন নদীটি ওক রিজেস মোরেইন এলাকা থেকে উৎপন্ন হয়ে লেক অন্টারিওর সঙ্গে যুক্ত কিটিং চ্যানেল পর্যন্ত বিস্তৃত।

একসময় পরিবেশ দূষণের করুণ প্রতীক হিসেবে পরিচিত ছিল কানাডার টরন্টো শহরের ডন নদী। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে ১৯৬৯ সালে একটি পরিবেশবাদী সংগঠন আনুষ্ঠানিকভাবে নদীটিকে ‘মৃত’ ঘোষণা করেছিল। শিল্পবর্জ্য, নগরায়নের চাপ এবং প্রাকৃতিক প্রবাহের বাধার কারণে ডন নদী কার্যত জীববৈচিত্র্যশূন্য হয়ে পড়েছিল। তবে দীর্ঘ কয়েক দশকের পরিকল্পিত পুনরুদ্ধার ও প্রাকৃতিক সংস্কার কার্যক্রমের ফলে আজ সেই ডন নদীতেই আবার ফিরছে প্রাণ।

সাম্প্রতিক পরিবেশগত পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, নদীর পুনরুদ্ধারকৃত অংশে বর্তমানে ২০টিরও বেশি প্রজাতির মাছ নিয়মিতভাবে বসবাস করছে। শুধু উপস্থিতিই নয়, এসব মাছের মধ্যে বিভিন্ন বয়স ও জীবনচক্রের নমুনা পাওয়া যাচ্ছে, যা নদীর পরিবেশ যে এখন স্বাস্থ্যকর ও স্থিতিশীল তারই প্রমাণ।

প্রায় ৩৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ডন নদীটি ওক রিজেস মোরেইন এলাকা থেকে উৎপন্ন হয়ে লেক অন্টারিওর সঙ্গে যুক্ত কিটিং চ্যানেল পর্যন্ত বিস্তৃত। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানায়, নদী পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে তাদের মূল দর্শন ছিল অবকাঠামো নির্মাণের আগে নদীর স্বাভাবিক চরিত্র ফিরিয়ে আনা। নদীকে আবার নিজের মতো করে বাঁক নিতে ও প্রবাহিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যাতে প্রাকৃতিক উপায়ে জীববৈচিত্র্য ফিরে আসে।

নদী সংস্কারের সময় আশপাশের স্বাভাবিক জলধারাগুলোকে আদর্শ হিসেবে ধরা হয়। নদীর তলদেশ ও পাড়জুড়ে এমন পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে, যা মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর জন্য উপযোগী। এর মধ্যে রয়েছে কাঠের গুচ্ছ দিয়ে তৈরি আশ্রয়স্থল, অগভীর পাথুরে অঞ্চল, ডিম ছাড়ার জন্য কাঁকর বিছানো স্থান এবং জলাভূমি এলাকায় নিরাপদ আবাস। এসব উদ্যোগ ধাপে ধাপে ডন নদীকে আবার প্রাণীদের জন্য বসবাসযোগ্য করে তুলেছে।

কর্তৃপক্ষের একজন পরিবেশ তত্ত্বাবধায়ক বলেন, “কখন আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেওয়া যায় যে একটি নদী আবার জীবিত হয়েছে, তা বলা কঠিন। তবে বাস্তবতা হলো ডন নদীতে এখন মাছ ভালোভাবেই টিকে আছে এবং তাদের সংখ্যা বাড়ছে। আগে যেসব প্রজাতির অস্তিত্ব কেবল নথিতে থাকত, এখন সেগুলো নিয়মিতভাবে নদীতে দেখা ও ধরা পড়ছে।”

নদীতে শুধু মাছই নয়, ব্যাঙ, পাখি ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীর উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক দিক হলো, এসব প্রাণী কোনো কৃত্রিম সংযোজন ছাড়াই স্বতঃস্ফূর্তভাবে নদীতে ফিরে আসছে। এমনকি পুনর্গঠন কাজ চলাকালীন সময়েও মাছের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়নি। বড় আকারের শিকারি মাছ থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রজাতির সাধারণ মাছ নতুন পরিবেশের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিচ্ছে।

পরিবেশবিদদের মতে, নদীতে বিভিন্ন বয়সের মাছের সহাবস্থান প্রমাণ করে যে এটি কেবল সাময়িক পুনরুদ্ধার নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ ও দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকার মতো বাস্তুতন্ত্র গড়ে উঠেছে। এর অর্থ, ডন নদী এখন শুধু জীবিতই নয়, বরং প্রজনন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম টিকিয়ে রাখার জন্যও উপযুক্ত হয়ে উঠেছে।

ডন নদীর এই পুনর্জাগরণ টরন্টোর পরিবেশ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। একসময় যে নদীকে নগর দূষণের প্রতীক হিসেবে ধরা হতো, আজ সেই নদীই নগর উন্নয়ন ও প্রকৃতি সংরক্ষণের সফল সমন্বয়ের উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ডন নদীর গল্প প্রমাণ করে যে সঠিক পরিকল্পনা, ধৈর্য ও সময় দিলে প্রকৃতি নিজেই তার হারানো প্রাণশক্তি ফিরে পেতে পারে। একসময় মৃত ঘোষিত ডন নদী আজ নতুন করে বইছে জীবনের বার্তা নিয়ে, যা বিশ্বের অন্যান্য নগর নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্পের জন্যও অনুপ্রেরণা হয়ে উঠতে পারে।

This article was written by Masud Karim as part of the LJI

Related Articles

Back to top button