
হাইতিতে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার মধ্যে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীকে সহায়তা দিতে ৬ কোটি ডলার অনুদানের ঘোষণা দিয়েছে কানাডা। জাতিসংঘ-সমর্থিত একটি আন্তর্জাতিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই অর্থ মূলত হাইতির গ্যাং দমন ও পুলিশ বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য ব্যয় করা হবে।
মঙ্গলবার জাতিসংঘ সদর দফতরে হাইতির পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনীতা আনান্দ এ সহায়তার ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, “আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় আমাদের একসঙ্গে কাজ করতেই হবে। হাইতির জনগণ এখন এমন এক সময় পার করছে, যখন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অপরিহার্য।”
২০২১ সালে প্রেসিডেন্ট জোভেনেল মোইজ হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই হাইতিতে রাজনৈতিক অস্থিরতা, দারিদ্র্য ও সশস্ত্র গ্যাংয়ের সহিংসতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বর্তমানে রাজধানী পোর্ট-অ-প্রিন্সসহ দেশটির অধিকাংশ এলাকাই গ্যাংদের নিয়ন্ত্রণে। তারা নিয়মিত অপহরণ, লুটপাট ও খুনখারাপিতে লিপ্ত হয়ে পুরো দেশকে অচল করে তুলেছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র ২০২4 সালেই হাজার হাজার মানুষ গ্যাং-সহিংসতার কারণে বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং দেশটির খাদ্য সংকট চরমে পৌঁছেছে।
হাইতির চলমান অস্থিতিশীলতার জন্য কানাডা দীর্ঘদিন ধরেই দেশটির কিছু প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক এলিটকে দায়ী করে আসছে। ২০২২ সাল থেকে কানাডা এসব ব্যক্তির ওপর কড়া আর্থিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। কানাডার যুক্তি ছিল, এই এলিট শ্রেণি গ্যাং নেতাদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে হাইতির অস্থিরতা আরও বাড়িয়েছে।
এছাড়া, কানাডা ইতোমধ্যেই কেনিয়ার নেতৃত্বাধীন জাতিসংঘ-সমর্থিত পুলিশ মিশনে ৮ কোটি ডলার সহায়তার অঙ্গীকার করেছে। এই মিশনের লক্ষ্য ছিল হাইতির নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল করা ও আসন্ন নির্বাচনের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা।
কানাডার নতুন ঘোষিত ৬ কোটি ডলার সহায়তা দুই ভাগে ব্যয় হবে ৪ কোটি ডলার ব্যয় হবে জাতিসংঘ অনুমোদিত নতুন নিরাপত্তা মিশনের জন্য, যা হাইতির স্কুলগুলো পুনরায় খুলে দেওয়া, গ্যাং দমন ও ক্ষুধা মোকাবিলায় ভূমিকা রাখবে।
২ কোটি ডলার বরাদ্দ করা হবে হাইতির উপকূলীয় এলাকায় মেরিটাইম নিরাপত্তা জোরদার করতে, যাতে দেশটিতে অস্ত্র ও মাদক পাচার বন্ধ করা যায়।
আনান্দ বলেন, “ক্ষুধা ও সহিংসতা একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। গ্যাংদের লুটপাট ও সহিংসতার কারণেই কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এই দুষ্টচক্র ভাঙতে শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি।”
একই সময় যুক্তরাষ্ট্রও হাইতি ইস্যুতে সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে আরও বৃহত্তর ও তহবিলসমৃদ্ধ গ্যাং-দমন বাহিনী গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করেছে। ওয়াশিংটন হাইতির পরিস্থিতিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য “গুরুতর হুমকি” হিসেবে দেখছে।
হাইতির সংকট কেবল একটি ছোট ক্যারিবীয় দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়; এটি বর্তমানে লাতিন আমেরিকা ও উত্তর আমেরিকার নিরাপত্তা ইস্যুতেও বড় প্রভাব ফেলছে। গ্যাংদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকায় মানবপাচার, অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা বেড়ে গেছে। ক্যারিবীয় অঞ্চলে পাচার রুটের বিস্তারে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর স্বার্থ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি সময়মতো পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে হাইতি আরও ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হতে পারে।
কানাডার এই ৬ কোটি ডলারের সহায়তা হাইতির জন্য নিঃসন্দেহে একটি তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে প্রশ্ন থেকে যায় এই আর্থিক সহায়তা কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হবে এবং হাইতির ভঙ্গুর প্রশাসনিক কাঠামো তা সামলাতে পারবে কি না।
আন্তর্জাতিক মহল এখন তাকিয়ে আছে জাতিসংঘের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে। যদি প্রস্তাবিত নিরাপত্তা মিশন অনুমোদন পায়, তাহলে হাইতির জন্য এটি হতে পারে এক নতুন সূচনার সম্ভাবনা। কিন্তু যদি না পায়, তাহলে দেশটির জনগণের দুর্ভোগ হয়তো আরও দীর্ঘায়িত হবে।



