হাডসন’স বের কাছে থাকা আদিবাসী শিল্পকর্ম ফেরত দেওয়ার আহ্বান গভর্নর জেনারেল মেরি সিমনের

জুমু চৌধুরী

সম্প্রতি কানাডার একটি আদালত এইচবিসিকে চার হাজারেরও বেশি ঐতিহাসিক শিল্পকর্ম নিলামে তোলার অনুমতি দিয়েছে।

কানাডার প্রথম আদিবাসী গভর্নর জেনারেল মেরি সিমন ঐতিহাসিক হাডসন’স বে কোম্পানির (এইচবিসি) কাছে সংরক্ষিত সব ধরনের আদিবাসী শিল্পকর্ম, নিদর্শন ও সাংস্কৃতিক সম্পদ আদিবাসী সম্প্রদায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার দৃঢ় আহ্বান জানিয়েছেন। ন্যাশনাল ইন্ডিজেনাস পিপলস ডে উপলক্ষে অটোয়ার রিডো হল প্রাঙ্গণে এক বিশেষ অনুষ্ঠানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “যদি হাডসন’স বের কাছে এখনো আদিবাসী শিল্পকর্ম থাকে, সেগুলো ফিরিয়ে দেওয়ার সময় এসেছে। এগুলো আদিবাসীদের প্রাপ্য।”

মেরি সিমনের বক্তব্য শুধুমাত্র সরকারি দায়িত্বের আওতাতেই সীমাবদ্ধ নয়, এতে রয়েছে গভীর ব্যক্তিগত অনুরণন। ইনুক মা এবং ইংরেজ পিতার সন্তান সিমনের শৈশব কেটেছে উত্তর কুইবেকের নুনাভিক অঞ্চলে অবস্থিত হাডসন’স বে কোম্পানির একটি আউটপোস্টে, যেখানে তাঁর পরিবার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করত। এই অভিজ্ঞতাই তাঁকে ঐতিহাসিক অন্যায়ের প্রশ্নে বিশেষভাবে সংবেদনশীল করে তুলেছে। তিনি বলেন, “আমি বিশ্বাস করি, হাডসন’স বে কোম্পানির সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এ বিষয়ে ইতিবাচক সমাধান সম্ভব।”

সম্প্রতি কানাডার একটি আদালত এইচবিসিকে চার হাজারেরও বেশি ঐতিহাসিক শিল্পকর্ম নিলামে তোলার অনুমতি দিয়েছে। এই শিল্পকর্মগুলোর মধ্যে অনেক নিদর্শনই কানাডার ফার্স্ট নেশনস, মেটিস এবং ইনুইট জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কংগ্রেস অব অ্যাবোরিজিনাল পিপলস, অ্যাসেম্বলি অব ফার্স্ট নেশনস এবং অ্যাসেম্বলি অব ম্যানিটোবা চিফস ইতোমধ্যে আদালতের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। তাদের দাবি, এসব নিদর্শন বিক্রি না করে সম্প্রদায়ের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে, কারণ এগুলো কেবল শিল্পকর্ম নয় এগুলো তাদের পরিচয়, আধ্যাত্মিকতা ও ইতিহাসের প্রতীক।

সিমন তাঁর বক্তব্যে ভ্যাটিকানের উদাহরণ টেনে বলেন, “আমরা ইতিমধ্যে দেখেছি, পোপ এবং ভ্যাটিকান কীভাবে নির্দিষ্ট কিছু আদিবাসী নিদর্শন ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। হাডসন’স বে কোম্পানিও চাইলে একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া তৈরি করতে পারে যার মাধ্যমে এসব শিল্পকর্ম কানাডার মাটিতে ফিরিয়ে এনে সম্প্রদায়ের কাছে হস্তান্তর করা সম্ভব।”

হাডসন’স বে কোম্পানি ৩৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কানাডার বাণিজ্য ও উপনিবেশিক বিস্তারে প্রভাব বিস্তার করেছে। এর অসংখ্য আউটপোস্ট ছিল কেবল বাণিজ্যকেন্দ্র নয়, বরং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের স্থান। এখানেই সংগৃহীত হয় বহু আদিবাসী নিদর্শন যার মধ্যে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী পোশাক, শিকার সরঞ্জাম, টোটেম খোদাই, অনুষ্ঠানিক মুখোশ ও পবিত্র সামগ্রী। ইতিহাসবিদদের মতে, এই সংগ্রহ কেবল অর্থনৈতিক লেনদেনের অংশ ছিল না, বরং আদিবাসী সংস্কৃতি দখল ও মুছে ফেলার ঔপনিবেশিক নীতির প্রতিফলন।

মেরি সিমন স্পষ্ট ভাষায় জানান, “এটি শুধু শিল্পকর্ম ফেরত দেওয়ার বিষয় নয়, এটি পুনর্মিলন ও ন্যায়বিচারের অংশ। আমাদের ইতিহাসের অন্ধকার অধ্যায়গুলোকে স্বীকার করতে হবে এবং সম্প্রদায়গুলোকে তাদের সাংস্কৃতিক সম্পদ ফিরিয়ে দিতে হবে, যাতে তারা তা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করতে পারে।”

রিডো হল প্রাঙ্গণের এই অনুষ্ঠানে স্থানীয় স্কুলের শিক্ষার্থীরাও অংশ নেয়। তারা ‘হার্ট গার্ড’-এ বার্তা লিখে আবাসিক স্কুল থেকে বেঁচে যাওয়া শিশুদের সংগ্রাম ও সাহসকে শ্রদ্ধা জানায়। এই প্রতীকী কর্মকাণ্ড সিমনের আহ্বানকে আরও তাৎপর্যময় করে তোলে।

কানাডার সাংস্কৃতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি হাডসন’স বে কোম্পানি আদিবাসী সম্প্রদায়ের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একটি রিটার্ন প্রটোকল তৈরি করে, তবে এটি দেশের পুনর্মিলন প্রক্রিয়ায় ঐতিহাসিক অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হবে। সরকারও ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা এই আলোচনায় মধ্যস্থতার জন্য প্রস্তুত।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই পদক্ষেপ শুধুমাত্র আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতি ন্যায়বিচারের প্রতীকই হবে না, বরং কানাডার ঐতিহাসিক দায় স্বীকার ও সাংস্কৃতিক পুনর্গঠনের পথকেও সুদৃঢ় করবে।

Related Articles

Back to top button