
কানাডার মতো উন্নত ও ধনী দেশে সামাজিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল পরিবারের অধিকাংশই দারিদ্র্যের গভীরতম স্তরে আটকে আছে। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ওয়েলফেয়ার ইন কানাডা ২০২৪ শীর্ষক প্রতিবেদন এই কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরে জানিয়েছে, সহায়তাভোগী পরিবারের ৯৮ শতাংশই দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। এর মধ্যে প্রায় ৭৩ শতাংশ পরিবার গভীর দারিদ্র্যের শিকার তাদের আয় দারিদ্র্যসীমার মাত্র ৭৫ শতাংশেরও কম।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান মৈত্রী প্রণীত এই প্রতিবেদনে কানাডার দশটি প্রদেশ ও অঞ্চলের সামাজিক সহায়তা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। চারটি মৌলিক ধরনের পরিবারের ওপর বিশেষভাবে আলোকপাত করা হয়েছে। যেমন – কর্মক্ষম একক ব্যক্তি, প্রতিবন্ধী একক ব্যক্তি, দুই বছরের সন্তানসহ একক অভিভাবক পরিবার , ১০ ও ১৫ বছর বয়সী দুই সন্তানসহ দম্পতি পরিবার। এছাড়া আলবার্টা ও ম্যানিটোবা প্রদেশে একটি করে এবং কুইবেক প্রদেশে দুটি অতিরিক্ত পরিবারের তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা সার্বিক ছবিকে আরও পরিষ্কার করে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রতিবন্ধী একক ব্যক্তিদের পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ। শিশুসম্বলিত পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে ফেডারেল ও প্রাদেশিক সরকার থেকে অতিরিক্ত ভাতা বা বেনিফিট পাওয়া যায়, যা কিছুটা হলেও তাদের জীবনযাত্রায় পার্থক্য তৈরি করে। কিন্তু একক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা এই অতিরিক্ত সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন। ফলে তারা শুধু আর্থিক কষ্টে নয়, সামাজিক সুরক্ষার ঘাটতির কারণেও আরও গভীর দারিদ্র্যের শিকার হন।
প্রধান লেখক জেনিফার লেইডলি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “এখানে সমস্যা কেবল দারিদ্র্য নয়, বরং অতিমাত্রায় দারিদ্র্য। কানাডার মতো ধনী দেশে প্রত্যেকেরই সামাজিক সুরক্ষা জালের ভেতরে থাকা উচিত। আর সেই সুরক্ষা এতটা শক্তিশালী হওয়া উচিত যাতে যে কেউ অন্তত দারিদ্র্যসীমার ওপরে ন্যূনতম জীবনযাপন করতে পারে।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, গত এক দশকে কানাডায় জীবনযাত্রার ব্যয় বিশেষ করে আবাসন, খাদ্য ও পরিবহনের ক্ষেত্রে দ্রুত বেড়েছে। অথচ সামাজিক সহায়তার পরিমাণ প্রায় অপরিবর্তিত থেকে গেছে। ফলে সহায়তাভোগীরা মৌলিক চাহিদা মেটাতেই হিমশিম খাচ্ছে। এমনকি কেউ কোথায় বাস করছে প্রদেশ বা অঞ্চলভেদেও পার্থক্য তৈরি হচ্ছে, যা সামাজিক বৈষম্যকে আরও তীব্র করছে।
গবেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন ছাড়া বিকল্প নেই। তাদের প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে সহায়তার পরিমাণ বাস্তব ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বৃদ্ধি করা, একক ব্যক্তি ও প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ চালু করা, প্রদেশভেদে বৈষম্য না রেখে সারাদেশে ন্যূনতম জীবনযাপনের মান নিশ্চিত করা।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, যদি এখনই এই পদক্ষেপগুলো না নেওয়া হয়, তবে দারিদ্র্যের ফাঁদ আরও গভীর হবে এবং এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে কানাডার সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্যে।
প্রতিবেদনটি এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে উন্নত দেশ হিসেবে কানাডা কি সত্যিই তার নাগরিকদের মৌলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে? যখন সামাজিক সহায়তা পাওয়া পরিবারের ৯৮ শতাংশই দারিদ্র্যসীমার নিচে জীবন কাটাচ্ছে, তখন বিষয়টি কেবল পরিসংখ্যান নয়, বরং নীতিগত ব্যর্থতার তীব্র প্রমাণ হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে।



