টরন্টোতে ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসে প্রথম সংক্রমণ শনাক্ত, সতর্কতায় জনস্বাস্থ্য বিভাগ

লিয়াকত আলী

চলতি বছরে কানাডার বৃহত্তম শহর টরন্টোতে প্রথমবারের মতো ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসে মানবদেহে সংক্রমণের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে।

চলতি বছরে কানাডার বৃহত্তম শহর টরন্টোতে প্রথমবারের মতো ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসে মানবদেহে সংক্রমণের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। টরন্টো পাবলিক হেলথ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছে, প্রাপ্তবয়স্ক এক ব্যক্তি এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। তবে আক্রান্ত ব্যক্তির বয়স, বাসস্থান বা শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করা হয়নি।

এ ঘটনায় প্রদেশ অন্টারিওতে চলতি বছরে ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়াল চারজন। সংখ্যাটি তুলনামূলকভাবে কম হলেও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এই ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, ২০২২ সালে প্রদেশজুড়ে মোট ২৯ জন মানুষ ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন, যার মধ্যে অন্তত চারজনের মৃত্যু ঘটে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণে থাকলেও জলবায়ু পরিবর্তন ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে ভাইরাসটি বহনকারী মশার বিস্তার বাড়ছে, যা ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগের বিষয়।

ওয়েস্ট নাইল ভাইরাস মূলত সংক্রমিত মশার কামড়ের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। কামড়ের দুই থেকে চৌদ্দ দিনের মধ্যে উপসর্গ দেখা দিতে পারে। প্রাথমিক উপসর্গগুলোর মধ্যে রয়েছে হঠাৎ জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব ও বমি, শরীরব্যথা, ত্বকে ফুসকুড়ি এবং লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়া।

বেশিরভাগ রোগী হালকা উপসর্গেই সেরে ওঠেন, কিন্তু বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং যাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল তাদের ক্ষেত্রে ভাইরাসটি মারাত্মক আকার নিতে পারে। গুরুতর অবস্থায় এটি স্নায়ুতন্ত্রে সংক্রমণ ঘটিয়ে মস্তিষ্কের প্রদাহ বা মেনিনজাইটিসের মতো জটিলতা তৈরি করতে পারে, যা প্রাণঘাতীও হতে পারে।

টরন্টো পাবলিক হেলথ নাগরিকদের সতর্ক থাকতে এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী বাইরে বের হলে হালকা রঙের, লম্বা হাতা জামা ও প্যান্ট পরা উচিত। হেলথ কানাডা অনুমোদিত মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করতে হবে। বাসাবাড়িতে জমে থাকা স্থির পানি দ্রুত ফেলে দিতে হবে, কারণ সেগুলো মশার প্রজননের আদর্শ স্থান। জানালা ও দরজায় নেট ব্যবহার এবং সেগুলো সঠিকভাবে বন্ধ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, এ বছর মশা পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় ফাঁদ বসিয়ে মশার নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা করা হচ্ছে যাতে সংক্রমণের ঝুঁকি দ্রুত শনাক্ত করা যায়।

জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উষ্ণ গ্রীষ্মকাল এবং আর্দ্র পরিবেশ মশার বংশবৃদ্ধির জন্য সহায়ক হয়ে উঠেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মশাবাহিত রোগ, বিশেষত ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসের মতো সংক্রমণের ঝুঁকি কানাডার মতো উত্তরাঞ্চলীয় দেশগুলোতেও বাড়ছে।

টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. মারিয়া ল্যাং এনআরবি টিভিকে বলেন, “আমাদের আগে যেখানে এ ধরনের ভাইরাস দক্ষিণাঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল, এখন আমরা তা কানাডার মধ্য ও পূর্বাঞ্চলেও দেখতে পাচ্ছি। এটি জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব।”

টরন্টো পাবলিক হেলথ সবাইকে আহ্বান জানিয়েছে, যদি কারও মধ্যে উপসর্গগুলো দেখা দেয়, তবে অবহেলা না করে দ্রুত স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। কারণ প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা জটিলতা অনেকাংশে কমিয়ে আনতে পারে।

সব মিলিয়ে, টরন্টোতে ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসে এ বছরের প্রথম সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ায় জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। যদিও পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণে, তবুও নাগরিকদের সতর্ক থাকা, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া এবং প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়াই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরক্ষা।

এই ঘটনার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট যে, কানাডার আবহাওয়ার পরিবর্তন জনস্বাস্থ্যের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসের মতো সংক্রমণগুলো কেবল স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি সতর্কবার্তাও বটে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা না করলে এমন ভাইরাসের বিস্তার আরও বাড়বে।

Related Articles

Back to top button