নিরাপত্তা ঘাটতিই ২০২২ সালের টরন্টো ফেরি দুর্ঘটনার মূল কারণ

জামির হোসেন

টরন্টোর জ্যাক লেটন ফেরি টার্মিনালে ২০২২ সালের ফেরি দুর্ঘটনার চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দ্য ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ড অব কানাডা (টিএসবি)

টরন্টোর জ্যাক লেটন ফেরি টার্মিনালে ২০২২ সালের ফেরি দুর্ঘটনার চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দ্য ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ড অব কানাডা (টিএসবি)। প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার মূল কারণ হিসেবে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি এবং ক্রুদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে ত্রুটি চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা রোধে বেশ কিছু সুপারিশও করা হয়েছে।

দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল ২০২২ সালের ২০ আগস্ট বিকেলে, যখন স্যাম ম্যাকব্রিজ প্যাসেঞ্জার ফেরি সেন্টার আইল্যান্ড থেকে ছেড়ে জ্যাক লেটন ফেরি টার্মিনালের দিকে আসছিল। ফেরিটিতে তখন ৯১০ জন যাত্রী এবং ৬ জন ক্রু ছিলেন, যা ফেরির ধারণক্ষমতার প্রায় সর্বোচ্চ সীমা।

ফেরিটি যখন বিকেল ৫টার পর টার্মিনালে পৌঁছায়, তখন বার্থিংয়ের সময় এটি ডকের সঙ্গে প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা খায়। এই ধাক্কায় দাঁড়িয়ে থাকা এবং সিঁড়িতে থাকা কমপক্ষে ২০ জন যাত্রী সামনের দিকে পড়ে আহত হন। আহতদের মধ্যে পাঁচজনকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়, এবং সবচেয়ে গুরুতর আহত ছিলেন মাত্র তিন বছরের একটি শিশু। শিশুর মা, জেসমিন ম্যালোরি, বলেন, “আমার বাচ্চার শরীর সামনের দিকে ছিটকে গেল। তার মুখ ও চোখে গুরুতর আঘাত লেগেছে, মুখ রক্তে ভরে গেছে। তাকে সেলাই করতে হয়েছে।”

টিএসবির তদন্তে দেখা গেছে, দুর্ঘটনার দিন ফেরিটি নির্ধারিত সময়ের তুলনায় দেরিতে ছাড়ে। দিনভর এটি আটটি ক্রসিং সম্পন্ন করে, প্রতিটি ক্রসিংয়ে যাত্রীদের সংখ্যা পূর্ণ থাকায় ক্রুদের ওপর অতিরিক্ত চাপ ছিল। সময়মতো যাত্রা সম্পন্ন করার তাগিদ ফেরিটির গতি বাড়িয়ে দেয়, যা দুর্ঘটনার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

তদন্তে আরও জানা যায়, ফেরিটির দুটি প্রোপেলারের মধ্যে কেবল একটি সচল ছিল, যা পর্যাপ্ত ছিল না। তবে পরবর্তী পরীক্ষায় দেখা যায়, প্রোপেলার সিস্টেমে কোনো প্রযুক্তিগত ত্রুটি ছিল না। অর্থাৎ দুর্ঘটনার মূল কারণ ছিল মানবিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং পরিচালনা প্রক্রিয়ার ঘাটতি, প্রযুক্তিগত ত্রুটি নয়।

টিএসবির প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, দুর্ঘটনা নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ এবং ফেরির গতির উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ থাকলে এড়ানো যেত। তারা উল্লেখ করেছে যে: ফেরিতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। ক্রুদের নিয়মিত নিরাপত্তা ও জরুরি পরিস্থিতি প্রশিক্ষণ দিতে হবে। অতিরিক্ত যাত্রী চাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতি প্রণয়ন করা জরুরি।

এই দুর্ঘটনা টরন্টোর গণপরিবহন নিরাপত্তার জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ দ্বীপপুঞ্জে যাতায়াত করেন, তাই তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি এখনই ফেরি পরিচালনা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকবে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক টমি হার্ডন এনআরবি টিভিকে বলেন, টরন্টোর নাগরিকদের জন্য এই দুর্ঘটনা শুধু একটি দুঃখজনক ঘটনা নয়, এটি নিরাপত্তা সংস্কৃতির প্রয়োজনীয়তা এবং মানবিক ত্রুটির প্রতিকার বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

Related Articles

Back to top button