
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে এক নাটকীয় মন্তব্য করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছেন। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি-এর সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্প বলেন, তার বিশ্বাস ইউক্রেন রাশিয়ার দখলে থাকা সব ভূখণ্ড পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবে।
এই বক্তব্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই ট্রাম্প শান্তি প্রতিষ্ঠার স্বার্থে “কিয়েভের কিছু ছাড় দেওয়া উচিত” বলে মন্তব্য করেছিলেন, যা তখন পশ্চিমা কূটনীতিকদের মধ্যে বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। এবার তিনি সম্পূর্ণ বিপরীত সুরে বলেছেন, সময়, ধৈর্য এবং ইউরোপের অর্থনৈতিক সহায়তার মাধ্যমে ইউক্রেন তার দখলকৃত অঞ্চলগুলো ফেরত পাবে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকের পর নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন: “ইউক্রেন-রাশিয়ার সামরিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে গভীরভাবে অবগত হওয়ার পর আমি উপলব্ধি করেছি রাশিয়ার অর্থনৈতিক সংকট এখন তীব্র। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোর সহায়তায় ইউক্রেন তার সমস্ত ভূখণ্ড পুনরুদ্ধার করতে পারবে। কেন নয়?”
তিনি আরও বলেন, রাশিয়া এখন “লক্ষ্যহীনভাবে যুদ্ধ করছে” এবং তাদের সামরিক অবস্থান দুর্বল। ট্রাম্পের ভাষায়, “রাশিয়া এখন এক ‘কাগুজে বাঘ’। সত্যিকারের সামরিক শক্তির কাছে পরাজিত হতে এক সপ্তাহেরও কম সময় লাগবে।”
ট্রাম্প দাবি করেন, রাশিয়ার অর্থনীতি “অভূতপূর্ব চাপে” রয়েছে, যা প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের অবস্থানকে দুর্বল করে তুলছে। তিনি বলেন, “এটাই ইউক্রেনের সুযোগ। যদি উভয় দেশ কিছু বিষয়ে সম্মত হয়, আমরা ন্যাটোর অবস্থান অনুযায়ী সহায়তা অব্যাহত রাখব অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও অর্থনৈতিক সমর্থনসহ।”
এ মন্তব্যকে অনেকে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। ২০২৪ সালের শেষ দিকে ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ইউক্রেন নীতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বিভাজন তৈরি হয়। ট্রাম্প তখন বলেছিলেন, “আমি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যুদ্ধ শেষ করতে পারব।” কিন্তু তার সর্বশেষ মন্তব্য বিশ্লেষকদের চোখে এক “বাস্তবসম্মত ও কৌশলগত পালাবদল”।
এদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বর্তমানে নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের উপলক্ষে। তিনি ইউরোপীয় ও আমেরিকান নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করছেন, যার উদ্দেশ্য রাশিয়ার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ অব্যাহত রাখা।
জেলেনস্কি বৈঠকে ট্রাম্পের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেন বলে মার্কিন কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে। বৈঠকে মূল আলোচ্য বিষয় ছিল ইউক্রেনের পুনর্গঠন, সামরিক সহায়তা বৃদ্ধি এবং যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা।
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশন-এর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্পের নতুন অবস্থান তার প্রশাসনের বাস্তব পরিস্থিতি স্বীকার করার প্রতিফলন। রাশিয়ার অর্থনীতি নিষেধাজ্ঞার চাপে বিপর্যস্ত, রুবলের মান কমছে, এবং সামরিক খাতে বিশাল ব্যয় দেশটির অভ্যন্তরীণ সংকট বাড়াচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ট্রাম্পের “কাগুজে বাঘ” মন্তব্যটি একদিকে রাশিয়ার প্রতি তীব্র বার্তা, অন্যদিকে মার্কিন ভোটারদের উদ্দেশে এক রাজনৈতিক ইঙ্গিত যে তিনি ইউক্রেন নীতিতে দৃঢ় অবস্থান নিতে প্রস্তুত।
ট্রাম্পের এই অবস্থান পরিবর্তন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতেই নয়, বরং ইউক্রেন যুদ্ধের ভবিষ্যত কৌশলেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। যুদ্ধের সাড়ে তিন বছর পর যখন ইউক্রেন ক্লান্ত কিন্তু এখনও লড়ছে, তখন বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী নেতার এই বার্তা কিয়েভের জন্য এক নতুন প্রেরণা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাশিয়া এখনো এই মন্তব্যের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি, তবে ক্রেমলিনের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে মস্কো ট্রাম্পের মন্তব্যকে “রাজনৈতিক কৌশল” হিসেবে দেখছে, যা মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অংশ।
তবে একথা স্পষ্ট ট্রাম্পের এই হঠাৎ ‘ইউক্রেনপন্থী’ বার্তা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন হিসাব-নিকাশের সূচনা করেছে।



